অনলাইন ডেস্ক : | মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০১৬ | প্রিন্ট | 1144 বার পঠিত
ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন, মাইক্রোবাসচালক আল আমিন আর সদ্য স্নাতক আহসানুল রনি—ভালোবাসেন বাংলাদেশের ক্রিকেট। তবে দারুণভাবে এই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন এই তিনজন। সে জন্যই তাঁরা আলাদা। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন পত্রিকায় প্রকাশিত ক্রিকেটের খবর কিংবা স্মারকের বড় সংগ্রহশালা।
‘২০০০-এর মতো জার্সি, ৬০০-৭০০ সই করা ব্যাট, ২০০ অটোগ্রাফসহ বল, একই পরিমাণ গ্লাভস’—সংগ্রহের বিবরণ দিতে থাকেন জসিম উদ্দিন। যতই তিনি বলেন ততই চমকে উঠতে থাকি। ওয়াসিম আকরাম, শেন ওয়ার্ন, মুত্তিয়া মুরালিধরন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মিনহাজুল আবেদীন, আকরাম খান, হাবিবুল বাশার, মাশরাফি বিন মুর্তজা—ক্রিকেটের সব কিংবদন্তির সই করা স্মারক তাঁর সংগ্রহে!
স্মারক সংগ্রহের ভাবনাটা এল কীভাবে? মুহূর্তেই ফ্লাশব্যাকে চলে যান জসিম, ‘একটা সময় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে নিয়মিত খেলা দেখেছি। নিজেরও ক্রিকেটার হওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। পারিনি। তাই ক্রিকেটের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছি। নিয়মিত মাঠে যেতে যেতে একটা সময় খেলোয়াড়-আম্পায়ারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে যায়। এভাবেই শুরু।’
জসিমের কর্মযজ্ঞের শুরু ১৯৯৬ থেকে। বাংলাদেশের তো আছেই; বাংলাদেশে যত খেলোয়াড় এসেছেন খেলতে, বেশির ভাগের জার্সি, ব্যাট, গ্লাভস তাঁর সংগ্রহে। ২০০৪ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু করেন স্টাম্প সংগ্রহ। ‘২০০৪ সালে বাংলাদেশ যেবার ভারতকে হারাল, দেখি খেলোয়াড়েরা স্টাম্প রেখে দিচ্ছেন নিজেদের কাছে। আমি টিভি আম্পায়ার নাদির শাহকে বললাম, আমাকে কি একটা দেওয়া যায়? এভাবেই স্টাম্প সংগ্রহ শুরু’—জসিমের মুখে গৌরবের হাসি।
বিরাট এই সংগ্রহশালায় গৌরবের উপাদান থাকলে কখনো কখনো কষ্টের অভিজ্ঞতাও হয়েছে জসিমের, ‘অনেকে সন্দেহ বা প্রশ্ন করে, খেলোয়াড়দের সই নেওয়া ব্যাট-বল-জার্সি আমি কী করি? বিক্রি করি? আমি কিন্তু শখের বশেই করি এটা। অনেক সময় একটা অটোগ্রাফের জন্য দুই মাসও অপেক্ষা করতে হয়। মনের কষ্টে ২০০৯-১০ দুই বছর সংগ্রহ বন্ধই করে দিয়েছিলাম। পরে ভাবলাম, মানুষ অনেক কথাই বলবে। বসে থাকলে চলবে না।’
পেশায় ব্যবসায়ী জসিম স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি এলাকায়। সংগ্রহ তাঁর এতটাই বড় ঢাকার বাসায় জায়গা হয় না বলে বরিশালের বাকেরগঞ্জে নিজেদের বাড়িতেও রেখেছেন অনেক কিছু। জানালেন, জায়গা বদলের কারণে তাঁর অনেক স্মারক হারিয়েও গেছে। তবু যা আছে সেটি দিয়েও একটা জাদুঘর তিনি অনায়াসে করতে পারেন। কিন্তু স্বপ্নটা পূরণ হবে কি না তা নিয়ে আছে মনে অনিশ্চয়তা, ‘একটা জাদুঘর তো করার ইচ্ছে ছিল। হবে কি না জানি না। ক্রিকেটের জন্য আমার সাধ্য নেই কিছু করার। কিন্তু আমার এই উদ্যোগ দেখে অনেকে অনুপ্রাণিত হতে পারেন।’
এরই মধ্যে ঢাকায় আসা আফগানিস্তান দলের খেলোয়াড়দের সই সংগ্রহ করা হয়ে গেছে জসিমের। এখন তাঁর অপেক্ষা ইংল্যান্ডের জন্য।
২০ হাত দৈর্ঘ্যের একটা টিনের ঘর। সেখানেই বাস আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন, হাবিবুল বাশার, মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিমদের! চমকে গেলেন?
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় আল আমিনের বাড়িটা দেখে আসতে পারেন। একটা ঘরজুড়ে শুধু পেপার কাটিং। ২০০৫ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু। চলছে এখনো। ১১ বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সব খবর মিলবে ঘরটায়। বাংলাদেশ যেদিন প্রথম টেস্ট জেতে, সেদিনই পোকাটা ঢোকে আল আমিনের মাথায়। সেদিন যেন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের যত খবর পত্রিকায় প্রকাশ হবে, সব তাঁর সংগ্রহে থাকা চাই। কিন্তু চাইলেই তা সম্ভব নয়। সময় ও আর্থিক বিষয়টিও এখানে জড়িয়ে।
আল আমিন তাই প্রথম আলো, যুগান্তর, কালের কণ্ঠ, সমকাল—কয়েকটি দৈনিকের কাটিং সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর নিয়মিত পত্রিকার খবরগুলো কেটে আঠা দিয়ে লাগিয়ে রাখেন হার্ডবোর্ডে। ‘এটা যখন শুরু করি আমাকে অনেকে পাগল বলত। আমার ছোট ভাই অনেক বাধাও দিয়েছে। কিন্তু মা আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি বলতেন, “ও পাগলামি করছে ক্রিকেটের জন্য, দেশের জন্য। কারও ক্ষতি তো করছে না!” মা আমার মারা গেছেন এই বছরের জানুয়ারিতে।’ জড়িয়ে আসে আল আমিনের কণ্ঠ।
শুধু দেশের খেলোয়াড়ই নন, আল আমিনের সংগ্রহে আছে দেশের বাইরের তারকাদের খবরের কাটিং। ক্রিকেটের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এতটাই যে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে যখন বিশ্বকাপ ট্রফিটা নিয়ে আসা হয়, সেটি দেখতে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে ছুটে এসেছিলেন ঢাকায়। ট্রফির পাশে তাঁর একটি ছবি পরে প্রকাশ হয়েছিল একটি অনলাইন পোর্টালে। ছবিটি প্রিন্ট করে বাঁধাই করে রেখেছেন ঘরে।
পেশায় মাইক্রোবাসের চালক আল আমিন প্রতিদিন যা আয় করেন তার বড় একটা অংশ ব্যয় হয় পত্রিকা কেনার কাজে। প্রতিদিন পেপার কাটিং সংগ্রহ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। কিছুদিনের বিরতি দিয়ে কাজটা করেন। যেদিন এটা করেন সেদিন আর গাড়ি চালানো হয় না। পেশায় ক্ষতি হলেও নেশাটাকেই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। শুধু ক্রিকেটই নয়, অন্য খেলায় দেশের বড় অর্জনগুলোও আছে তাঁর সংগ্রহে। একদিন সংগ্রহশালাটা বড় জাদুঘরে রূপ নেবে এটাই তাঁর স্বপ্ন—‘ক্রিকেটকে ভীষণ ভালোবাসি। ভবিষ্যতে একটা জাদুঘর তৈরির ইচ্ছে আছে। পারব কি না কে জানে! করতে পারলে নতুন প্রজন্ম এই সংগ্রহ থেকে অনায়াসে জানতে পারবে আমাদের ক্রিকেটের ইতিহাস।’
স্বপ্নটা হচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সব খবর সংগ্রহ করা। রনি অবশ্য তারও আগে থেকেই টুকটাক পেপার কাটিং সংগ্রহ করতেন। তবে মুলতান টেস্টের পর স্বপ্নটা জেঁকে বসে ভালোভাবেই। এক-দুই করে প্রায় একটা যুগ কেটে গেছে পেপার কাটিংয়ের পেছনে। রংপুরের রবার্টসনগঞ্জ মণ্ডলপাড়ায় তাঁর বাড়িটা ক্রমেই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘আর্কাইভ’! পরে রনির সংগ্রহে যোগ হয়েছে আরও নতুন কিছু, তাঁর ভাষায়, ‘২০০৩ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় সব ম্যাচের পেপার কাটিং আমার কাছে আছে। ২০১৫ থেকে বাংলাদেশের সব ম্যাচের ছবি প্রিন্ট করা শুরু করি।’
রনির ঘরে বাঁধাই করা ছবিগুলো দেখলে মূর্ত হয়ে উঠবে বাংলাদেশের বহু স্মরণীয় মুহূর্ত। মূলত প্রথম আলোসহ ১০-১২টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার খবর সংগ্রহ করেন রনি। শুধু ছেলেদের নয়, মেয়েদের ক্রিকেটেও সমান নজর তাঁর। বাংলাদেশ মেয়েদের দলের অধিনায়ক জাহানারা আলমের ভক্ত তিনি, তাঁর সব ছবি আছে সংগ্রহে।
শুরুতে অনেক বাধা এসেছে পরিবার থেকে। পরে অবশ্য সবাই সহায়তা করেছেন তাঁকে। রনি কৃতজ্ঞতা জানান বন্ধু মাসুদ পারভেজ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) সভাপতি জুনায়েদ পাইকারকে।
এই সংগ্রহে আছে খরচের হ্যাপা। তবু গত বছর স্নাতক শেষ করা রনি এটা চালিয়ে যাচ্ছেন কীভাবে? তিনি বলেন, ‘খরচটা নির্ভর করে ম্যাচের ওপর। এমনিতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ছবি পেলেই প্রিন্ট করে ফেলি। সাধারণত আমার হাতখরচের টাকা থেকেই কাজটা করি।’
রনিরও স্বপ্ন তাঁর সংগ্রহশালা ভবিষ্যতে রূপ পাবে এক জাদুঘরে।
সূত্র: প্রথম আলো
Posted ১:৪৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০১৬
America News Agency (ANA) | Payel