বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

>>

কী তৈরি হয় না ধোলাইখাল ও জিনজিরায়

  |   মঙ্গলবার, ১১ জুলাই ২০১৭   |   প্রিন্ট   |   1239 বার পঠিত

কী তৈরি হয় না ধোলাইখাল ও জিনজিরায়

পুরান ঢাকার ধোলাইখাল আর কেরানীগঞ্জের জিনজিরা বিখ্যাত বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য। খুব কম জিনিসই আছে, যা কি না সেখানকার দক্ষ কারিগররা তৈরি করতে পারেন না। ইঞ্জিন-যন্ত্রাংশ, গাড়ির ক্ষুদ্র পার্টসসহ প্রায় ২০০ ধরনের মেশিনারিজ উৎপাদন ও বাজারজাতের বিশাল সম্ভাবনার খাত হয়ে উঠেছে ‘ধোলাইখাল ব্র্যান্ড’। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপাড়ে জিনজিরায় কয়েক যুগ ধরে গড়ে উঠেছে লৌহশিল্পের হাজার হাজার কারখানা। শুধু চোখের দেখায় তৈরি করছেন চীনা-জাপানি মডেলের নানা ধরনের যন্ত্রাংশ। এছাড়া সারা দেশেই আড়ালে-আবডালে ঘটে চলেছে এক অভাবনীয় বিপ্লব। দেশীয় প্রযুক্তির ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ উদ্ভাবন, উৎপাদন ও বাজারজাতে বদলে গেছে দৃশ্যপট। এই ক’দিন আগেও অতি প্রয়োজনীয় যেসব যন্ত্রপাতি ও মেশিনারিজ শতভাগ আমদানিনির্ভর ছিল, আজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে সেগুলো রীতিমতো রফতানি করা হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ও হালকা শিল্পে ব্যতিক্রমী সাফল্যের মাধ্যমে কয়েক যুগ ধরেই দৃষ্টান্ত হয়ে আছে জিনজিরা। এখানকার ঝুপড়ি বস্তির অজস্র কারখানায় খুদে ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি করা হাজারো পণ্যের কদর রয়েছে সর্বত্র। দেশ-বিদেশে ‘মেড ইন জিনজিরা’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতিও আছে এসব পণ্যের। রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরঘেঁষা জিনিজরা-শুভাঢ্যা থেকে শুরু করে কেরানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়েই জিনজিরা শিল্পের অভাবনীয় বিস্তার। অনর্গল ইঞ্জিনের ঢস ঢস, ঘট ঘট শব্দ, কারিগরের সদা ব্যস্ত হাঁকাহাঁকি, শ্রমিকদের কোলাহল-আওয়াজ ঘুচিয়ে দিয়েছে সেখানকার রাত-দিনের ব্যবধান। গত দুই দশকে ‘জিনজিরা শিল্প’ অগ্রসর হয়েছে অনেক দূর। এখন আর তা জিনজিরা-কেরানীগঞ্জে সীমাবদ্ধ নেই, সম্প্রসারিত হয়েছে রাজধানীর আনাচে-কানাচে, দেশজুড়ে। জিনজিরার পাশাপাশি ইঞ্জিন-যন্ত্রাংশ, গাড়ির ক্ষুদ্র পার্টসসহ প্রায় ২০০ ধরনের মেশিনারিজ উৎপাদন ও বাজারজাতের বিশাল সম্ভাবনার খাত হয়ে উঠেছে ‘ধোলাইখাল ব্র্যান্ড’। ধালাইখাল ব্র্যান্ডের কারিগররা বাইসাইকেল থেকে শুরু করে সব ধরনের গাড়ি, ট্রাক্টর, ক্রেন, রি-রোলিং মিল, এমনকি ট্রেনের বগিসহ যাবতীয় যন্ত্রাংশ অনায়াসে প্রস্তুত করছেন। এ ছাড়াও রাজধানীর মীরহাজিরবাগ, মাতুয়াইল, ডেমরা, চকবাজার, লালবাগ, ইসলামবাগ ও মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে জিনজিরা শিল্পের আদলে অসংখ্য ক্ষুদ্র কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। শুধু ঢাকায় নয়, জিনজিরা মডেল অনুসরণ করে নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, চট্টগ্রাম, যশোরের নওয়াপাড়া, টঙ্গী-গাজীপুর, পাবনা, নাটোর ও রাজশাহী অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পইউনিট।
মেড ইন জিনজিরা
একটা সময় ছিল, যখন কোনো পণ্য নকল হলে বা গুণগতমান খারাপ হলে মেড ইন জিনজিরা বলে আখ্যা দেয়া হতো। বর্তমানে বাংলার চীন, বাংলার জাপান বা মেড ইন জিনজিরা ইত্যাদি নামে পরিচিত কেরানীগঞ্জ উপজেলার জিনজিরা ইউনিয়ন। জিনজিরার মূল অংশটি তাওয়াপট্টি নামে পরিচিত। বুড়িগঙ্গা তীরঘেঁষে এর অবস্থান। তাওয়াপট্টিতে গড়ে ওঠা টিনের ঘরের ছোট ছোট কারখানায় তৈরি হয় বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। এখানকার কারিগররা এতটাই দক্ষ যে, তারা কোনো যন্ত্রাংশের নমুনা দিলে হুবহু তা বানিয়ে দিতে পারেন। সেগুলো টেকসই ও মানসম্মত। আর এসব যন্ত্রপাতি তৈরিতে যেসব যন্ত্র বা মেশিন দরকার হয় তা নিজেরাই বানিয়ে নেন। তাই এটাকে নকল বলা চলে না, এটা হচ্ছে অনুকরণ। এখানকার তৈরি যন্ত্রাংশের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
তাওয়াপট্টির ব্যবসায়ী শরীফুল ইসলাম বলেন, রিপিট তৈরির একটি অটো-মেশিন জাপান থেকে আনতে খরচ হয় ১৬-১৭ লাখ টাকা, চীন থেকে আনতে খরচ হবে ১০-১২ লাখ টাকা, অথচ এ মেশিন আমরা তৈরি করে দেই মাত্র আড়াই থেকে তিন লাখ টাকায়। স্প্রিং তৈরির একটি মেশিন পাশের দেশ ভারত থেকে আনতে খরচ হয় ছয়-সাত লাখ টাকা। এখানে এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচে সেই মেশিন তৈরি হয়। বিদেশ থেকে ভালো কোনো মেশিন এলে সেই মেশিনটিই জিনজিরার কোনো কারিগর মাত্র দুই থেকে সাত দিনের মধ্যে হুবহু তৈরি করে দিতে পারবেন! ধরা যাক কোনো পার্টস এসেছে, সেই মডেলের পার্টস দেখে হুবহু বানিয়ে দিতে পারেন এখানকার কাজ করতে করতে দক্ষ হয়ে ওঠা শ্রমিকেরা। মূলত অনুকরণই তাদের মূল ভরসার জায়গা।
তাওয়াপট্টির ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, আমরা গবেষণা করি না। আমাদের বেশির ভাগ কারিগর অল্পশিক্ষিত। আমরা দেখে দেখেই বানাই। এতে খরচও কম এবং সস্তা দামে তা দেশের বাজারে বিক্রি করা যায়। জাহাজ ভাঙার স্ক্র্যাপ, বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, রোলিং মিল, নির্মাণাধীন স্থাপনার বাতিল লোহা ও শিট সংগ্রহ করে সেগুলো থেকে নানা যন্ত্রাপাতি তৈরি করা হয় এখানে। ছোট ছোট টিনের ঘরে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি মেশিনেই বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করা হয়। এখানকার কারিগরদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। কাজ করতে করতে একসময় দক্ষ কারিগরে পরিণত হন এরা।
ধোলাইখাল ব্র্যান্ড
ধোলাইখাল ব্র্যান্ডের কারিগররা বাইসাইকেল থেকে শুরু করে সব ধরনের গাড়ি, ট্রাক্টর, ক্রেন, রি-রোলিং মিল, এমনকি ট্রেনের বগিসহ যাবতীয় যন্ত্রাংশ অনায়াসে প্রস্তুত করছেন। দেশের এ হালকা প্রকৌশল শিল্পে প্রায় তিন হাজার ৮০০ ধরনের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে, যার মধ্যে ১৩৭টি আইটেম রফতানি হচ্ছে বিশ্বের ১৭টি দেশে। পুরান ঢাকার মৈশুণ্ডি, নবাবপুর, টিপুসুলতান রোড, বনগ্রাম, ওয়ারী ও পাশের এলাকায় এ শিল্পের বিস্তৃতি ঘটেছে। ধোলাইখাল ও আশপাশে রয়েছে ছোট-বড় অর্ধলক্ষাধিক ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ বা হালকা প্রকৌশল শিল্পের নানা স্থাপনা। সাম্প্রতিক সময়ে খুদে কারিগরেরা সামুদ্রিক জাহাজের অতি মূল্যবান পিনিয়ামও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
বাংলাদেশকে ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতার পাশাপাশি বিরাট সাফল্য এনে দিয়েছে। ঢাকার চাহিদার বেশির ভাগ মেটাচ্ছে জিনজিরা ও ধোলাইখালে তৈরি লৌহজাত এসব উপকরণ। চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এগুলো সুনামও অর্জন করেছে। মেড ইন জিনজিরার পণ্যের চাহিদা ও কদর ক্রমেই বাড়ছে। দামে সস্তার পাশাপাশি মানের দিক থেকেও এগিয়ে যাচ্ছে এখানকার যন্ত্রপাতি। এসব কারণে ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে।

Facebook Comments Box

Comments

comments

Posted ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১১ জুলাই ২০১৭

America News Agency (ANA) |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

শারদীয় ভূষণ
(1637 বার পঠিত)
[abm_bangladesh_map]
Editor-in-chief :
Sayeed-Ur-Rabb
Corporate Headquarter :

44-70 21st.# 3O1, LIC. New York-11101. USA,

06463215067

americanewsagency@gmail.com

Copyright © 2019-2025Inc. America News Agency (ANA), All rights reserved.ESTD-1997