অনলাইন ডেস্ক : | বুধবার, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ | প্রিন্ট | 1402 বার পঠিত
দৃষ্টি নন্দন ও নয়নাভিরাম হাতিরঝিল সমন্বিত প্রকল্পে সম্প্রতি চালু হওয়া ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি রাজধানীতে ভ্রমণ পিপাসুদের নৌকা ভ্রমণের স্বাদ কিছুটা মেটাতে সক্ষম হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর এ সার্ভিস উদ্বোধনের পর থেকেই এতে কিছুক্ষণ ভ্রমণের জন্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভিড় দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দৈনিক ১৬ ঘণ্টা চালু থাকা এ ট্যাক্সি সার্ভিস মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, গুলশান থেকে হাতিরঝিল লেক পেরিয়ে ওয়াটার ট্যাক্সি-১ এফডিসি টার্মিনালে এসে থামতেই হৈ হৈ করে নামতে দেখা গেল একঝাঁক স্কুলপড়ুয়া শিশুকে। প্রথমবারের মতো জলযানে চড়ার আনন্দ তাদের চোখেমুখে। স্কুল ছুটির পরে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে এ ওয়াটার ট্যাক্সিতে চড়েছে ওরা। মাত্র ২০ মিনিটের যাত্রা হলেও ওদের আনন্দ ২০ গুণ বেশি। আর এ আনন্দ কেবল শিক্ষার্থী সিফাত, হাসিব, জিশান আর রায়হানেরই নয়, নিত্যদিন হাতিরঝিলের এক পাশ থেকে অন্য পাশে গিয়ে যাদের প্রয়োজনীয় কাজ সারতে হয় তাদেরও। বিশেষ করে বাড্ডা, রামপুরা থেকে মগবাজার, কারওয়ান বাজারমুখী মানুষ যানজটহীন যাত্রার সুযোগ পেয়ে তো মহাখুশি। ওদের মতে, ওয়াটার ট্যাক্সিতে যানজট নেই, এতে চড়ে সময় সাশ্রয় হচ্ছে অনেক বেশি। আর পানিতে চড়ার সুখটাও অন্যরকম। গত দুই দিন হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সির অবস্থা জানতে গিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে এমন মন্তব্য পাওয়া যায়।
১২ বছরের মেয়ে মুমতাহিনাকে নিয়ে ওয়াটার ট্যাক্সিতে চড়তে মিরপুর থেকে এসেছেন কলেজ শিক্ষক নাহিদ হোসেন। কেমন লেগেছে, জানতে চাইলে তিনি উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলেন, ছোটবেলায় গ্রামে নৌকায় চড়েছি। ঢাকায় আসার পর থেকে আর ওঠা হয়নি। মেয়েকে চড়াতে আনলেও আমিই মনে হয় বেশি উপভোগ করেছি। লেকের জলে ভেসে বেড়ানোর এই মুহূর্ত ছোটবেলায় মধুমতি নদীতে চড়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তার সঙ্গে থাকা বন্ধু রিয়াজ আল হাসান বলেন, উদ্যোগটা প্রশংসার। আমি ফ্রান্সে থাকি। ওখানে দেখেছি শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী আর লেকগুলোতে এমন বাহনের ব্যবস্থা আছে। এতে দুটি উপকার। একদিকে যানজটহীন সহজ যাত্রা হচ্ছে, অন্যদিকে দৃষ্টিনন্দন।
হাতিরঝিলের এফডিসি টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে সকাল থেকেই। যাত্রীদের সামলাতে কাউন্টারে থাকা সোহেল রানাকে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে। খানিকটা ভিড় কমার পরে তিনি বলেন, ‘কী অবস্থা তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। যাত্রীদের আনাগোনা বাড়ছে। তবে এখন যারা ওয়াটার ট্যাক্সিতে চড়ছেন, তাদের বেশিরভাগই হাতিরঝিলে ঘুরতে আসা মানুষ। সবাই যখন এ ট্যাক্সির খবর পেয়ে যাবে তখন যাত্রী সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে যাবে।
এ ট্যাক্সি চালুর ফলে বাড্ডা, গুলশান, রামপুরা, খিলগাঁওসহ নগরীর পূর্বাংশের মানুষ কারওয়ান বাজার, মগবাজার, দিলু রোড, ইস্কাটন, বাংলামোটর, তেজগাঁওয়ের যাতায়াত ব্যবস্থা আরো সহজ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ সার্ভিস বারিধারা লেক পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা যায়।
বর্তমানে চলাচলকারী ওয়াটার ট্যাক্সিতে একসঙ্গে ৩০জন যাত্রী চড়তে পারেন। এফডিসি টার্মিনাল থেকে গুলশান টার্মিনালে যেতে সময় লাগে ২০ মিনিট। এর চেয়েও ৫ মিনিট কমে ট্যাক্সি পৌঁছে যায় রামপুরা টার্মিনালে। এফডিসি থেকে রামপুরা টার্মিনাল পর্যন্ত ২৫ টাকা ও গুলশান টার্মিনাল পর্যন্ত ৩০ টাকা টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। হাতিরঝিল প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাজউকের তত্ত্বাবধানে আগামী ২০ বছর এই সেবার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে করিম গ্রুপকে। তারাই টিকিট বিক্রি থেকে শুরু করে যাত্রী পরিবহনের সব সেবা দেবে সাধারণ যাত্রীদের।
এ বিষয়ে হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকর্তা মেজর শাকিল হোসেন বলেন, সার্ভিস ঠিকভাবে সব চলছে কি-না তা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। কারো কোনো সমস্যা যাতে না হয়, সে বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করছি। তবে হাতিরঝিল লেকে ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চললেও গুলশান লেকে বিকেল ৫টায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ গুলশান লেকটা আমাদের প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই ওখানকার নিরাপত্তার বিষয় ভেবেই বিকেলে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
ট্যাক্সি সার্ভিস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান করিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদ মিয়া জানান, ট্যাক্সি নির্মাতা কোম্পানি ‘তাড়াতাড়ি শিপইয়ার্ড’ আমাদের জানিয়েছে যে, দুর্ঘটনার শিকার হলেও ফাইবার দিয়ে তৈরি এ ট্যাক্সিগুলো কখনই পানিতে তলিয়ে যাবে না। এগুলোর বডি অন্য যে কোনো বোটের তুলনায় দশগুণ দীর্ঘস্থায়ী। এ ছাড়া বোটগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব জনবল দিয়ে এই সার্ভিস পরিচালনা করা হচ্ছে। একটি ট্যাক্সির সঙ্গে অপর ট্যাক্সির কাউন্টারে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্তরা ওয়াকিটকির মাধ্যমে যোগাযোগ করবেন। কোনো জরুরি প্রয়োজনে আমাদের রেসকিউ টিম রয়েছে, তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে। এ ছাড়া হাতিরঝিল এলাকার নিরাপত্তায় নিয়োজিত রেড ফোর্সের সদস্যরা তো থাকছেনই। তারাও আমাদের সহযোগিতা করবেন। প্রতিটি ট্যাক্সির ধারণক্ষমতা ধরা হয়েছে ৩০ জন। সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে সেবা চালু থাকবে রাত ১০টা পর্যন্ত। দিনে ১৬ ঘণ্টা সেবা প্রদান করা হবে। একটি ট্যাক্সি ঘণ্টায় ১২০ জন যাত্রীকে সেবা দিতে পারবে। ১৬ ঘণ্টা করে ৪টি ট্যাক্সি একদিনে প্রায় আট হাজার যাত্রী সেবা দিতে সক্ষম হবে। তাছাড়া এ বহরে আগামী জানুয়ারিতেই যুক্ত হবে আরো দুটি ওয়াটার ট্যাক্সি। যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী পরে ওয়াটার ট্যাক্সির সংখ্যা ২০ থেকে ২৫টিতে উন্নীত করা হবে।
এনা/পা/বাং/মানক
Posted ১:০২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২১ ডিসেম্বর ২০১৬
America News Agency (ANA) | Payel