অনলাইন ডেস্ক : | সোমবার, ১৩ মার্চ ২০১৭ | প্রিন্ট | 1212 বার পঠিত
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তন সংলগ্ন স্বাধীনতা স্তম্ভটির পাশ দিয়ে লম্বা পথটি সোজা নিচে নেমে গেছে। ঢালু পথ ধরে হাঁটলেই দেখা যাবে মাটির নিচে বর্ণিল আলোকসজ্জার মাঝে জ্বলজ্বল করছে স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল বিজয় ইতিহাস। দোতলা ঘরটির নিচের অংশে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার ইতিহাস। আছে একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ২৬ হাজার ঘটনার আলোকচিত্র ও তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। আছে মোগল আমলসহ বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের আলোকচিত্র। ১৪৪টি প্যানেলে বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাস আলোকচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। স্বাধীনতার ইতিহাসের পাশাপাশি সেই প্রাচীনকাল থেকে বাঙালির জীবন-সংগ্রামের নানা চিত্রও সেখানে স্থান পেয়েছে।
জাদুঘরে প্রবেশের পর প্রথমেই চোখে পড়বে পশ্চিম দেয়ালে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের বিশাল ছবি। তবে শুরুটা আসলে বাংলা শিলালিপির উৎপত্তি ও তার বিবর্তনের ছবি দিয়ে। রয়েছে মধ্য ও আধুনিক যুগে বাংলার মানচিত্র, বাংলাদেশে নীল বিদ্রোহ, ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ফাঁসির দড়িতে ঝোলানোর পূর্ব মুহূর্তে কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর সেই দুর্লভ ছবি। আছে ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ দিবসে ঢাকার নবাবপুর রোডে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের শোভাযাত্রার ছবি। এ ছাড়া রয়েছে ভাষা সংগ্রামের শহীদ রফিক আহমদ, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, সফিউর রহমান ও আবদুস সালামের ছবি।
দেখা যাবে ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের কাছে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিপরিষদের কৃষি ও বনমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের শপথ গ্রহণের সেই দুর্লভ ছবিটিও। ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্রনেতা আসাদের ছবি। আছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকার পাতায় উঠে আসা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কথা। তারই একটি উদাহরণ ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ ‘সংবাদ’ পত্রিকার মূল শিরোনাম ছিল ‘এবার স্বাধীনতার সংগ্রাম :মুজিব’। আলোকচিত্র আর ঘটনাপ্রবাদ দেখতে দেখতে যতই এগিয়ে যাওয়া হবে ততই যেন প্রবেশ ঘটবে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে। ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ ২৫ মার্চ কালরাতের ছবিগুলো মনে করিয়ে দেবে পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতার চিত্র।
আরও আছে মুক্তিযুদ্ধের রণক্ষেত্র ও যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি। একাত্তরে মুক্তি সংগ্রামের পাশাপাশি অন্যরকম কিছু ছবিও আছে। ১৯৭১ সালের ২২ জুন সংগ্রাম পত্রিকায় জামায়াত নেতা গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তাও রয়েছে ছবি আকারে। আছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের ছবি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের পূর্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি মিত্রবাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে কলম চেয়ে নিচ্ছেন সেই ছবি ও আত্মসমর্পণের ছবি। যে টেবিলের ওপর লে. জে. আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন, তার অনুকৃতি প্রদর্শন করা হচ্ছে এ জাদুঘরে। তবে মূল টেবিলটি প্রদর্শন করা হচ্ছে জাতীয় জাদুঘরের মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারিতে। বিভিন্ন বিদেশি পত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কপি ও স্বাধীনতার সপক্ষে বহির্বিশ্বে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পুস্তিকার ছবি।
স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ও কাশেফ চৌধুরী জাদুঘরটি নির্মাণশৈলীর পরিকল্পনা করেছেন। তাদের স্থাপত্যনকশা অনুযায়ী পাতালে অবস্থিত জাদুঘরটির বিশাল এলাকাজুড়ে ফাঁকা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। তবে পুরো জায়গাজুড়েই স্থানে স্থানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সময়ের ছবি। জাদুঘরের মাঝখানে রয়েছে একটি ফোয়ারা। নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়াটার ফল’। ফোয়ারাটি নেমে এসেছে মাটির উপরিভাগ থেকে। ৭ একর বিস্তৃত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত। এই স্থাপনায় রয়েছে ৫ হাজার ৬৬৯ বর্গমিটার পাকা চাতাল বা প্লাজা এবং এর চারপাশে রয়েছে তিনটি জলাশয়, বাঙালি জাতিসত্তার অমরতার প্রতীক ‘শিখা চিরন্তন’ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভিত্তি করে নির্মিত একটি দেয়ালচিত্র। জাদুঘরের উপরিভাগে রয়েছে ১৫৫ আসন সংখ্যার আধুনিক মানের মিলনায়তন। স্বাধীনতা স্তম্ভটি বস্তুত ১৫০ ফুট উচ্চ একটি গ্গ্নাস টাওয়ার। গ্গ্নাস টাওয়ারে স্থাপিত লাইটের আলোকরশ্মি পাঁচ কিলোমিটার উঁচুতে প্রক্ষেপিত হয়।
পেশায় ব্যাংকার শহীদুল ইসলাম। উত্তরা থেকে তার পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে মার্থা ইসলামকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন স্বাধীনতা জাদুঘর। দুর্লভ সব ছবি দেখেছেন আর ইতিহাসের অলিগলিতে হেঁটেছেন। শহীদুল ইসলামের মতো আরও অনেকেই সময় পেলে ছুটে আসেন স্বাধীনতা জাদুঘরে। জাদুঘরের স্থাপত্য দেখে মুগ্ধ হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী অরিন নুজহাত। তিনি বলেন, ‘স্থাপত্য অসাধারণ, অসম্ভব সুন্দর।’ তবে মুক্তিযুদ্ধঘেঁষা কোনো নিদর্শন না থাকায় অনেকেই হতাশা ব্যক্ত করেছেন। আলোকচিত্রের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন রাখা উচিত–এমনটাই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন আগত দর্শনার্থীরা।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে স্বাধীনতা জাদুঘর পরিচালিত হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণ করছে গণপূর্ত বিভাগ। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সমকালকে বলেন, ‘পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, স্বাধীনতা স্তম্ভ আর স্বাধীনতা জাদুঘর-মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস ধারণ করছে। এখন অনেকেরই কাছে পরিণত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে জানার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। মুক্তিযুদ্ধের সব ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়েছে এই জাদুঘরে। তবে জাদুঘরটি নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন যুক্ত করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। আজ সোমবার এ সংক্রান্ত একটি সভা হওয়ার কথা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে নতুন প্রজন্মের যেমন আগ্রহের শেষ নেই, তেমনি যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে লড়েছেন বা প্রত্যক্ষ করেছেন তারাও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে যেন সবকিছু আবার নতুন করে দেখার অনুভূতি পান_ সেটাই হচ্ছে স্বাধীনতা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য।
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস জানতে হলে একটিবার হলেও সবারই জাদুঘরটি ঘুরে দেখা উচিত। জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিবিজড়িত বেশকিছু নিদর্শন আনার প্রক্রিয়া চলছে। আশা করা হচ্ছে, তিন থেকে চার মাসের মধ্য নিদর্শনগুলো ঢাকায় আনা হবে। সেগুলো স্বাধীনতা জাদুঘরের প্রতিস্থাপন করা হবে। সম্ভাব্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধ ট্যাঙ্ক, কামান, গোলা-বারুদ ও যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা নানা সামগ্রী। কারও কাছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন থাকলেও যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করে তা প্রদর্শন করা হবে।’
শনিবার থেকে বুধবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে জাদুঘরের দরজা। প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা। ১২ বছরের কম বয়সীদের জন্য লাগবে ২ টাকা। সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে জাদুঘরটি বন্ধ থাকে। শুক্র ও শনিবার স্বাধীনতা জাদুঘরের মিলনায়তনে বিনা টিকিটে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র দেখানো হয়। -এস এম মুন্না-সমকাল
Posted ১২:৫২ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৩ মার্চ ২০১৭
America News Agency (ANA) | Payel