মামুনুর রশীদ মিতুল : | শুক্রবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | প্রিন্ট | 1235 বার পঠিত
দেশের বিখ্যাত অনেক পর্যটন স্পট দেখা হয়েছে আগেই। তাই বেশ কিছুদিন যাবৎই দেশের বাইরে কোথাও ভ্রমণের চিন্তাধারা মনের মধ্যে পোষণ করে আসছিলাম। সময়-সুযোগের অভাবে তা হয়ে উঠছিল না। অবশেষে সিদ্ধান্তটা পাকা করেই ফেললাম। হ্যাঁ, এবার বেরোবই। কিন্তু কোন দেশে? এই উত্তরটা পেতেও বেশি সময় লাগল না। কেননা আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে রয়েছে অপূর্ব সব দর্শনীয় স্থান, যেগুলো দেখলে নাকি চোখ জুড়িয়ে যায় আর মনে আসে পরম তৃপ্তি। ভারতে গেলে আরও একটি ঐতিহাসিক নিদর্শনের দেখা মিলবে, সেটা হলো আগ্রার তাজমহল। আজ থেকে আড়াই শ বছর আগে মোগল স্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজকে কীরূপ ভালোবাসতেন, তার এক জীবন্ত নিদর্শন এই তাজমহল। তাই ভারতে ভ্রমণে যাওয়ার পেছনে এই অপূর্ব দৃশ্য দেখার লোভও অন্যতম কারণ। অতি সম্প্রতি ১১ দিনের জন্য বেরিয়ে পড়লাম ভারত ভ্রমণে। আমার সঙ্গী হলেন মামাতো ভাই তুহিন আহমদ পায়েল। পাসপোর্ট আগেই করা ছিল। কেবল বাকি ছিল ভিসা। পায়েল ভাই আর আমি দুজনই দাঁড়ালাম ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসিতে, পেয়ে গেলাম ভিসাও। এবার যাওয়ার পালা। প্রথমবার যাচ্ছি বলে দুজনই ভীষণ উৎফুল্ল, শিহরিত। ঠিক করলাম রেলেই হবে আমাদের স্বপ্নের ভারত ভ্রমণ। সপ্তাহে তিন দিন, অর্থাৎ সোম, বুধ ও শুক্রবার ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন থেকে নিয়মিত কলকাতার উদ্দেশে ছেড়ে যায় দুই দেশের সৌহার্দ্যরে প্রতীক-মৈত্রী এক্সপ্রেস। ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে কলকাতার উদ্দেশে ট্রেন ছেড়ে যায় সকাল ৮টায়। তাই স্টেশনে সময়মতো হাজির হলাম। স্টেশনে পৌঁছে দেখি অনেক মানুষের ভিড়। সবাই দীর্ঘ লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আমরাও দাঁড়ালাম। চেকিং শেষ করে একজন একজন করে ভেতরে ঢুকতে হলো। ট্রেনে ওঠার পর সময়মতো ট্রেন ছাড়ল। ট্রেনের মধ্যেই সকালের নাশতা সারলাম। অন্য যাত্রীদের কেউ ঘুমাচ্ছে আবার কেউ গল্প করে সময় কাটাচ্ছে। বেলা দেড়টায় দর্শনা স্টেশনে পৌঁছালে আমরা ট্রেন থেকে নেমে লাইনে দাঁড়ালাম ইমিগ্রেশনের জন্য। ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেকিংয়ের পর ট্রেন আবারও চলতে শুরু করল। দর্শনা থেকে ট্রেন ছাড়ার আধঘণ্টা পরই ভারত বর্ডার গেদে স্টেশনে আবারও চেকিংয়ের জন্য নামতে হলো। চেকিংয়ের কাজ শেষ হলে ট্রেন যাত্রা শুরু করল কলকাতা স্টেশনের দিকে। এ সময় বাইরে তাকিয়ে দেখি, চারদিকে শুধুই সবুজের সমারোহ। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সবুজের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। সবুজ বৃক্ষ, মাঠঘাট পার হওয়ার মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সঙ্গে পড়ন্ত বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাস, ট্রেনের ঝমঝম শব্দ-সব মিলিয়ে এক অপরূপ আবহ মনটাকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলল। চারপাশের এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে পৌঁছে গেলাম কলকাতা স্টেশনে। রেল থেকে নেমে অপূর্ব এই স্টেশন দেখেই মনটা খুশিতে নেচে উঠল। আমরা যে ভারতে মাটিতে পা দিয়ে ফেলেছি! এখনই দেখতে শুরু করব নয়নাভিরাম নানা দৃশ্য। স্টেশন থেকে বের হয়ে আমরা একটি ট্যাক্সি ভাড়া করলাম। গন্তব্যস্থল নিউমার্কেট। ঠিক করলাম সেখানে গিয়ে একটা হোটেলে উঠব। প্রথমবার এসেছি, অপরিচিত জায়গা, একটু চিন্তাও ছিল। চারপাশ দেখতে দেখতে নিউমার্কেট এলাকায় পৌঁছালাম। নিউমার্কেট এলাকায় অনেক স্ট্রিট রয়েছে-মারকাস স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট আরো কত নাম! এসব স্ট্রিটের আশপাশে অনেক হোটেলও রয়েছে। এগুলোর একটিতেই আমরা নোঙর ফেললাম। হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবারের জন্য বের হলাম। খাবার শেষে একটু ঘোরাঘুরি। রাত তখন ১০টা। দীর্ঘ জার্নিতে অনেক ক্লান্তি পেয়ে বসেছিল, তাই হোটেলে ফিরে বিছানায় গা এলাতেই ঘুমের রাজ্যে চলে গেলাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করে বের হলাম শহরের কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখার জন্য। পায়ে হেঁটেই আশপাশটা দেখে নিলাম। এবার দিল্লি যাওয়ার ট্রেনের টিকিট করতে হবে। কলকাতার ডালুস নামক স্থানে বিদেশিদের জন্য ভারতের যেকোনো জায়গায় যাওয়ার টিকিট পাওয়া যায়। সেখান থেকে আমরা রাজধানী এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কাটলাম। তখন চলছে কালীপূজা। পূজা উপলক্ষে পুরো কলকাতা শহরকে রংবেরঙে সাজানো হয়েছে, অনেকটা আমাদের ঢাকায় ঈদের সময় যে রকম সাজানো হয়। নিউমার্কেটর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম সেখানে কালীপূজার অনুষ্ঠান চলছে। লোখমুখে শুনলাম, এখানে অতিথি হিসেবে থাকবেন বলিউডের চিত্রনায়িকা প্রীতি জিনতা। প্রিয় নায়িকা প্রীতিকে কাছ থেকে দেখার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। লেগে গেলাম প্রীতি জিনতার অনুষ্ঠান দেখতে। প্রথমবারের মতো প্রীতি জিনতাকে কাছে দেখতে পেয়ে নিজেকে গর্বিতই মনে হলো। অনুষ্ঠান শেষে নিউ মার্কেটের ডান দিক থেকে হেঁটে একটু সামনে যাই, সেখানে বিগ বাজার শপিং মল। সেখানে কিছু কেনাকাটা করে নিলাম। পরদিন সকালে রওনা হলাম দিল্লির উদ্দেশে। বিকেল ৪টায় কলকাতা হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে যায়। আমরা একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই দেখা হলো হাওড়ার সেই ঐতিহ্যবাহী ব্রিজ। হাওড়া ব্রিজ কলকাতার হুগলী নদীর ওপর অবস্থিত বড় তিনটি ব্রিজের একটি। বিশ্বের ব্যস্ততম প্রসারিত খিলান সেতুর মধ্যে হাওড়া ব্রিজ অন্যতম। হাওড়া ব্রিজ প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার যানবাহন ও অসংখ্য পথচারীর চলাচলের ভার বহন করে। হাওড়া সেতু নির্মাণ করতে নাকি দীর্ঘ ৭ বছর সময় লেগেছিল। হাওড়ার এই প্রসারিত খিলান সেতুর কাজ সম্পন্ন হয় ১৯৪৩ সালে। এই সেতুর নির্মাণে খরচ হয়েছিল তৎকালীন সময়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা। এর পুরো কাঠামোটি রিভেট দ্বারা নির্মিত, যেখানে কোথাও নাট ও বল্টুর ব্যবহার দেখা যাবে না। এটি ৭০৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৯৭ ফুট চওড়া। হাওড়া ব্রিজের পরিকাঠামো ২৬,৫০০ টন প্রসারণসাধ্য ইস্পাত দ্বারা নির্মিত, যা দুটি স্তম্ভ দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত। প্রতিটি স্তম্ভ রাস্তার ঊর্ধ্বভাগে ৯০ মিটার জুড়ে অবস্থিত। বর্তমানে হাওড়া ব্রিজ কলকাতার প্রবেশদ্বারস্বরূপ, যেটি এই শহরকে হাওড়া স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করে, যা হলো কলকাতার মূল ও ভারতের সবচেয়ে ব্যস্ততম রেলওয়ে স্টেশন। হাওড়া ব্রিজ থেকে আমরা সোজা চলে এলাম কলকাতা মিউজিয়াম দেখতে। স্থপতি ডব্লিউএল গ্র্যানভিল ১৮৬৭ সালে এখানকার ভিক্টোরিয়ান সৌধটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, যার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ১৮৭৫ সালে। চৌরঙ্গী রোডের ওপর সবুজ ময়দানের পাশে বর্তমান প্রাসাদে স্থাপিত জাদুঘরটি ১৮৭৮ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বর্তমানে জাদুঘরটির প্রতœতত্ত্ব বিভাগের গ্যালারিগুলোর সংগ্রহে রয়েছে প্রাক ও আদি ঐতিহাসিক, মৌর্য, শুঙ্গ, সাতবাহন, গান্ধার, কুষাণ, গুপ্ত, পাল-সেন, চণ্ডেল, হোয়সলা ও চোল যুগীয় শিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য বহু যুগেরও প্রাচীন নিদর্শন। রহস্যঘেরা মিসরীয় সভ্যতাকে তুলে ধরতে জাদুঘরটিতে একটি বিশেষ গ্যালারি রয়েছে। যেখানে প্রদর্শন করা হয় প্রধান আকর্ষণ মমিসহ মিসরীয় সভ্যতার বেশ কিছু প্রাচীন নিদর্শন। এছাড়া সংস্কৃত, প্রাকৃত, ফারসি, উর্দু ও আরবি ভাষার শিলালিপি, পাণ্ডুলিপি ও সিলমোহর উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও আধুনিককালের মুদ্রাগুলো কয়েকটি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়। শিল্পকলার এই শাখাটিতে ভারতীয় চিত্রকলা, বস্ত্রশিল্প ও অলঙ্করণ সামগ্রীর পাশাপাশি নেপাল, তিব্বত, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও ইরানের শিল্পসামগ্রীও প্রদর্শিত রয়েছে। জাদুঘরটির নৃবিজ্ঞান শাখায় প্রতœ-নৃতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের বিভাগ এবং এর সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সজ্জিত একটি গ্যালারি। রয়েছে বিজ্ঞান শাখারও অনেক গ্যালারি। প্রাণিবিদ্যার গ্যালারিগুলোতে কীটপতঙ্গ, মাছ, উভচর প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রদর্শিত হচ্ছে। অর্থকরী উদ্ভিদ শাখায় ভেষজ গাছগাছড়া, উদ্ভিজ তন্তু, রঞ্জক উদ্ভিদ, আঠা ও রেসিন, দারু, তেল ও তেলবীজের সংগ্রহ রয়েছে। কালের সাক্ষী ঐতিহাসিক এই জাদুঘরটির বয়স প্রায় দুইশ বছর। শুরুর দিকে ছোট পরিসরে প্রতিষ্ঠিত হলেও ক্রমে এর পরিসর এবং সুনাম দুটিই বাড়তে থাকে। বর্তমানে উপমহাদেশে তো বটেই, সারা বিশ্বেই জাদুঘরটি প্রথম সারির মধ্যে পড়ে। আর শুধু নিজস্বই নয়, প্রায় দুইশ বছরের ইতিহাস নিয়ে এখনো দর্শনার্থীদের প্রদর্শন করে পৃথিবীর ইতিহাসের অনেক কিছুই। মিউজিয়াম-হাওড়া ব্রিজ ও আশপাশের কয়েকটি দর্শনীয় স্থান দেখার পর ফিরে এলাম স্টেশনে। স্টেশনের অনুসন্ধান থেকে জেনে নিলাম দিল্লি যাবার রাজধানী এক্সপ্রেসটি কত নাম্বার প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে। হাওড়া স্টেশনটি অনেক বড়, সেখানে ৩০টি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। বিকেল ৪টায় ট্রেন ছাড়ল। ট্রেনেই আমাদের ১৭ ঘণ্টার মতো থাকতে হবে। একটি কেবিনে ৬ জন করে বসা যায়। আমাদের কেবিনে আমরা দুজন ছাড়াও আরও চারজন ছিলেন। তাদের সঙ্গে পরিচিত হলে তারা দিল্লি সম্পর্কে আমাদের প্রয়োজনীয় অনেক তথ্য দিলেন। দীর্ঘ ভ্রমণ বলে ট্রেনের ভেতরেই সব ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়। এ জন্য অতিরিক্ত কোনো টাকা দিতে হলো না। সবাই মিলে কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে গেলে কেবিন বয় এসে আমাদের চা, নাশতা, পানি ও জুস দিয়ে গেল। আবার রাতের খাবারের জন্য অর্ডারও নিয়ে গেল। নাশতা সারার পর ট্রেনের বাইরে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে এবং গল্পগুজব করতে করতে কখন যে রাত হয়ে গেল, টেরই পায়নি। একসময় ক্লান্তি নেমে এলে যথাসময়ে রাতের খাবার খেয়ে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম। কেবিনের সিটগুলো সিঙ্গেল হলেও বিছানার মতো করে ঘুমানো যায় নিচে-উপরে বামে ও ডানে তিনটি করে। কেবিনে ঘুমটা ভালোই হলো। ট্রেনের যাত্রীসেবাও ছিল যথেষ্ট ভালো। তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবকিছু মিলিয়ে দারুণ। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাশতা করলাম। ১০টার দিকেই আমরা পৌঁছে গেলাম নয়াদিল্লি স্টেশনে। বিশাল বড় ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে এখন আমরা! ট্রেন থেকে নেমেই চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম স্টেশনটা বিশাল বড়, অজস্র মানুষেরা চলাফেরা এবং প্রতি মুহূর্তে এখানে ট্রেন আসছে ও যাচ্ছে। এসব দেখতে দেখতে রওনা হলাম হোটেলের দিকে। স্টেশনের পাশেই পাহাড়গঞ্জ, যেখানে রাস্তার দুই পাশে বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। আমরাও একটা হোটেল ঠিক করে সেটাতে উঠলাম। ঘণ্টা খানেক বিশ্রাম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে হোটেলেই খাওয়াদাওয়া শেষ করে বেরিয়ে পড়লাম। দিল্লিতে দেখার মতো উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলো হলো বিড়লা মন্দির, পার্লামেন্ট হাউস, প্রেসিডেন্ট ভবন, ইন্ডিয়া গেট, ইলেভেন স্টেটাস, তিন মূর্তি, ইন্দিরা গান্ধী মহল, লোটাস টেম্পল, রাজঘাট, জামে মসজিদ, লালকেল্লা ছাড়াও আরও অনেক স্থান। দেখার জন্য আমরা প্রথমেই শুরু করলাম বিড়লা মন্দির থেকে। এর কারুকাজ অত্যন্ত নান্দনিক। ভেতরে রয়েছে দেখার মতো অনেক জিনিস, যা পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। বিড়লা মন্দির থেকে আমরা রওনা হলাম ইন্ডিয়া গেটের উদ্দেশে। অবশ্য ইন্ডিয়া গেটে যাওয়ার আগে পথিমধ্যে পার্লামেন্ট ভবন ও প্রেসিডেন্ট ভবনও দেখে নিলাম। নিরাপত্তার কারণে যদিও সেটি বাইরে থেকেই দেখতে হলো। সাধারণের জন্য সেখানে প্রবেশাধিকার অনেকটা সংরক্ষিত। এরপর সেখান থেকে আমরা ইন্ডিয়া গেটে পৌঁছালাম। ইন্ডিয়া গেট ভারতের একটি স্মৃতিসৌধ, যা দিল্লির অন্যতম দর্শনীয় স্থান। দেশি-বিদেশি হাজার হাজার পর্যটক এখানে আসে তা দেখার জন্য। এর নকশা সবাইকে আকর্ষণ করে। এটি লাল ও সাদা বেলে পাথর ও গ্রানাইট দিয়ে তৈরি। এখান থেকে বেরিয়ে ইলেভেন স্টেটাস ও তিন মূর্তি দেখে চলে এলাম দিল্লির অন্যতম উপসনালয়ে, যেটিকে লোটাস টেম্পল বলা হয়। এর প্রতিটি নকশা বৈচিত্র্যময়। এই উপাসনালয় সবচেয়ে সুন্দর ফুল ও পবিত্রতার প্রতীক। লোটাস টেম্পল নয়টি বৃহৎ জলাধারা দ্বারা বেষ্টিত, যেটি উপসনালয়ের ভেতরের কক্ষ প্রাকৃতিক নিয়মে ঠান্ডা রাখে। এর ওপরে পদ্মফুলের মতো পাপড়িগুলো সাদা সিমেন্ট, বালি, নুড়ি দ্বারা নির্মিত এবং বাইরের অংশ গ্রিক মার্বেল পাথর দিয়ে আচ্ছাদিত। সব ধর্মের মানুষের জন্য এই উপাসনালয় উন্মুক্ত। সারি বেঁধে দলে দলে লোক ঢুকছে সেখানে। ঘুরেফিরে দেখছে অনন্য এই স্থাপনাটি। এর সবটাই যেন নৈঃশব্দ্যের প্রচ্ছন্নতায় এক অনুপম আবেশে মোহময়তায় আবিষ্ট। মনমাতানো তৃপ্তি নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। সেখান থেকে চলে যাই কুতুব মিনারে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ ইটনির্মিত মিনার। এটি কুতুব কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত। প্রাচীন হিন্দুমন্দিরের ধ্বংবাশেষ পাথর দিয়ে এই কমপ্লেক্স এবং মিনার তৈরি। ভারতীয় স্থাপত্যশৈলী গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন বলে কুতুব মিনার বেশ উল্লেখযোগ্য। এর আশপাশে বেশ কিছু প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় স্থাপনা রয়েছে, যা একত্রে বর্তমানে কুতুব মিনারের অংশ হিসেবে পরিচিত। এই কমপ্লেক্সটি ইউনেসকো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসেবে তালিকাবদ্ধ রয়েছে। চমৎকার এই মিনারটি দেখে চলে গেলাম রাজঘাট, যেখানে মহাত্মা গান্ধীর সমাধি।
রাজঘাট বেশ সুন্দর করে সাজানো। নিচে সবুজ ঘাস আর চারপাশে দেয়ালের মধ্যে গাছগাছালি পরিবেশটাকে আরও রূপসী করে তুলেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় পুরো দৃশ্যটি আমরা উপভোগ করতে পারিনি। পুরোটা সৌন্দর্য দেখতে হলে সকালে গেলেই ভালো। যাহোক আমরা ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে রওনা হলাম। আসার পথে দেখে নিলাম রাতের দিল্লি শহরকে, সাজানো-গোছানো আর অনেক পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। বুঝলাম রাতের দিল্লি আর আর রাতের ঢাকার মধ্যে কত তফাত! এ সময়টায় দিল্লিতে আবার চলছে দেওয়ালি। এজন্য সুন্দর করে যেন সেজে উঠেছে শহরটি। দেওয়ালি উপলক্ষে শহরটি বিভিন্ন রকম ঝাড়বাতি দিয়ে সাজানো হয়। চারদিকে আলোকসজ্জার অপরূপ সব দৃশ্য চোখে পড়ে। দেখতে দেখতে হোটেলে ফিরলাম। পরদিন ট্যুরিস্ট বাসে করে ছুটে এলাম আগ্রায় তাজমহল দেখতে। প্রায় ৪ ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম আগ্রায়। আগ্রা দেখার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে বলে আমাদের মনে এক অপূর্ব প্রশান্তি ছোঁয়া লাগল। প্রথমে গেলাম সম্রাট শাহজাহানের বাড়ি, যা আগ্রার কেল্লা নামে পরিচিত। অনেক বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা এটি। দেখা হলো আগ্রার কেল্লা। তারপর বাস চলে গেল তাজমহলের দিকে। মোগল সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত এই অনন্য মহলটি সম্রাটের প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হয়ে আছে, যা সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজের ভালোবাসার পবিত্রতা ও সৌন্দর্যকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। এই চমৎকার সমাধিসৌধ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। গেট পেরিয়ে তাজমহলের মূল সৌধের কাছে যেতে কিছুটা পথ হাঁটতে হয়। নিচ থেকে কয়েকটি সিঁড়ি পার হয়ে তাজমহলের মূল বেদিতে প্রবেশ করলাম। অপরুপ সৌন্দর্যমণ্ডিত এই সমাধিসৌধটি ২০ হাজার লোকের ২২ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৬৫৩ সালে আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে নির্মাণ করা হয়। দিল্লি, কান্দাহার, লাহোর ও মুলতানের সুদক্ষ রাজমিস্ত্রিরা এ নির্মাণকাজ করেন। এছাড়া বাগদাদ, শিরাজ এবং বোখারার অনেক দক্ষ নির্মাতা তাজমহলের বিশেষ কাজগুলো করেন। তাজমহলে আলোপ্রবাহী অস্বচ্ছ সাদা মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাজস্থান থেকে আনা হয়েছিল। তাছাড়া লাল, বাদামি পাথর, বৈদুর্যমণি, সবুজ-নীলাভ, নীলকান্তমণি, সাদা রঙের মূল্যবান পাথর ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাজমহলকে সৌন্দর্যের এক অপরূপ রূপে পরিণত করেছে। সময় তখন গোধূলি পেরিয়েছে মাত্র। তাজমহলের এই অপরূপ দৃশ্যে গোধূলির মায়া যোগ করায় যেন সেখানে অদ্ভুত সৌন্দর্যে ভরে উঠল। এতদিন লোকমুখে শুনে আসা তাজমহলের এই অপূর্ব রূপ দেখে আমাদের মনে হলো, বাস্তবের তাজমহল আরও চিত্তাকর্ষক, আরও মুগ্ধছড়ানো। স্রাট শাহজাহান তার স্ত্রীকে যে কী পরিমাণ ভালোবাসতেন, তা এই তাজমহলের অপূর্ব রূপ না দেখলে বোঝা সত্যিই অগম্য। আজ বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে হত্যা কিংবা নির্যাতনের ঘটনার কথা শুনলে মনে এই আক্ষেপ হয় যে, আহারে ওই দম্পতিরা কি একবারও শাহজাহান-মমতাজের নাম শোনেননি! শাহজাহান-মমতাজের প্রেমের শতভাগের একভাগও যদি ওই দুর্ভাগা দম্পতিদের মধ্যে থাকত, তাহলে স্বামী-স্ত্রীতে হত্যা-নির্যাতন দূরে থাক, সামান্য মন-কষাকষিও হতো না। আমরা কি পারি না এই প্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিজেদের জীবনে প্রতিফলন ঘটাতে। তাহলে পৃথিবীটা আরও সুন্দর আরও মহৎ হতো। যাহোক তাজমহলের মায়া কাটিয়ে ঘরে ফেরা সত্যিই দুরূহ। তার পরও ফিরতে হয়। তাই এবার ফেরার পালা। পথে মথুরা, রামকৃষ্ণের জন্মস্থান, বৃন্দাবন ঘুরে দেখলাম। এখানে বৃন্দাবন মন্দিরের সমস্ত জায়গায় বিচরণ করা বানরের কথা তো না বললেই নয়, এই এলাকায় কয়েকটি জায়গায় প্রচুর বানর রয়েছে। তবে সাধারণত তাদের বানর বলে ডাকলে তারা রাগ করতে পারে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারলাম, এসব বানরকে রাধে বলে ডাকলে এরা খুশি হয়। বাস থেকে নামার পর সেখানে পরিচয় হলো দুজন বাঙালির সঙ্গে। দুজনই ঢাকায় থাকেন। আলাপের একপর্যায়ে একজন খাবার আনতে গেলেন। কিন্তু নিয়ে আসার পথেই বানরগুলো হাত থেকে খাবার নিয়ে নিল। তাৎক্ষণিক খারাপ লাগলেও বিষয়টি অনেক মজার ছিল। স্থানীয়দের একজন বললেন, এখানকার রাধেরা (বানর) এ রকমই, খাবার সাবধানে আনতে হয়। নতুবা সবটাই তারা সাবাড় করতে পারে। রাত প্রায় ২টায় হোটেলে ফিরলাম। পরদিন লালকেল্লা ও জামে মসজিদ দেখা হলো। লালকেল্লাও মোগল সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত একটি দুর্গ। স্থাপত্য ও চিত্রকলার উৎকর্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। লালকেল্লার অলঙ্করণ ও শিল্পকর্ম অতি উচ্চমানের। কেল্লার প্রাচীর মসৃণ এবং দৃঢ়। লালকেল্লায় ঢুকতে আচ্ছাদিত বাজার পথ পড়ে। ভেতরে বিশাল জায়গা নিয়ে নির্মিত। প্রতœতাত্ত্বিক জাদুঘরসহ অনেক নিদর্শন রয়েছে। এরপর গেলাম মোগল আমলের ঐতিহাসিক দিল্লি জামে মসজিদে। এখানে ২৫ হাজার লোক একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। বিকেলে আমাদের ফিরতে হবে কলকাতায়। কলকাতা ফেরার ট্রেন হাওড়া এক্সপ্রেস বিকেল ৪টায় দিল্লি স্টেশন থেকে ছাড়ে। দিল্লিতে অনেক রকমের খাবার পাওয়া যায়। পরিচিত চিকেন টিক্কা, শিক কাবাব, ঘিরি ও গুর্দার কাবাব তো আছেই। তার সঙ্গে কাকরি, টেংরি, কস্তুরি, হারিয়ালি বাহারি আরো কত কাবাব। খাওয়াদাওয়া শেষে স্টেশনে পৌঁছালাম। পরদিনই পৌঁছে যাই কলকাতায়। আমাদের ভ্রমণ ছিল ১১ দিনের। কলকাতা শহরের আরো কয়েকটি দর্শনীয় স্থান দেখে নিলাম। ভিক্টোরিয়া পার্ক, ভিক্টোরিয়া মিউজিয়ামসহ কয়েকটি জায়গা। কলকাতায় সামান্য দূরত্বগুলো হেঁটেই চলাফেরা করতে হয়, অবশ্য রিকশা চলে মার্কেট এরিয়ায়। তবে বড় রাস্তায় অনুমতি নেই। ব্যবহার করতে হয় ট্যাক্সি। এছাড়া রয়েছে লোকাল বাস, এসি বাস, ট্রেন, ট্রাম, মেট্রোরেল প্রভৃতি। কলকাতার চায়ের কথা না বললেই নয়, অসাধারণ স্বাদের এ চায়ের কাপগুলো মাটির তৈরি, খাওয়ার পরই ভেঙে ফেলতে হয়। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের ১১ দিনের ভারত ভ্রমণ ছিল অসাধারণ। কীভাবে যাবেন : বাংলাদেশিদের জন্য বিমান, সড়ক এবং রেলপথে খুব সহজেই কলকাতায় যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা থেকে বিমানে সুভাষ চন্দ্র বসু বিমানবন্দরে যাওয়া যাবে। রেলপথে ঢাকা-কলকাতার ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ করে কলকাতায় পৌঁছাতে পারবেন। ঢাকা থেকে সড়কপথে শ্যামলী পরিবহনে সরাসরি কলকাতা যেতে পারবেন। ঢাকার কল্যাণপুর, শ্যামলী ও গাবতলীতে বাস সার্ভিস রয়েছে। বাসগুলো সরাসরি কলকাতার নিউমার্কেটে গিয়ে থামে।
ভিসা প্রসেসিং : ভারতে ভ্রমণকারীদের জন্য ভারত সরকার বিভিন্ন মেয়াদের ভিসা প্রদান করে থাকে। ভিসা প্রসেসিং করার জন্য সবার আগে ই-টোকেন সংগ্রহ করতে হয়। ই-টোকেন আবেদনের তিন কার্যদিবসের মধ্যে ভিসা প্রদান করে থাকে। তবে ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ও সিদ্ধান্তের বিষয়টি নির্ভর করে ভারত হাইকমিশনের ওপর। ঠিকানা : ভারত হাইকমিশন, লেক ভিউ, বাড়ি ১২, সড়ক ১৩৭, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র : ভারত ভ্রমণের ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য প্রয়োজন বৈধ পাসপোর্ট, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের ২ কপি ছবি, কর্মস্থলের ছুটির সার্টিফিকেট, ভ্রমণ ভিসার অনুমোদনপত্র, বিদ্যুৎ বিলের মূলকপি, বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের কপিসহ ছয় মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ইত্যাদি।
থাকা-খাওয়া : প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ছুটিতে, ব্যবসায়, চিকিৎসা, শিক্ষা-সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ততম শহর দিল্লি ও কলকাতায় ভ্রমণ করে থাকেন। সেখানে আধুনিক পরিকাঠামোযুক্ত অসংখ্য হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ রয়েছে এবং বিশ্রাম ও থাকাসহ রয়েছে দেশি-বিদেশি মজাদার খাবারের ব্যবস্থা। কেনাকাটা : দিল্লি ও কলকাতা পর্যটকদের ‘কেনাকাটার স্বর্গোদ্যান’ বলা হয়ে থাকে। এসব শহরজুড়ে বহু বাজারঘাট রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে ফ্যাশনের অনেক কিছুই একই ছাদের নিচে পাওয়া যায়। কলকাতার নিউমার্কেট, বিগবাজার ও সিটি হার্ট শপিং সেন্টারগুলো বেশ জনপ্রিয়।
লেখক : সাংবাদিক
Posted ৪:২৫ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৭
America News Agency (ANA) | Payel