শিরোনাম

প্রচ্ছদ খোলা কলাম, শিরোনাম

অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে সম্মুখ সারির যোদ্ধা ডাক্তাররা

ডা. নুজহাত চৌধুরী | বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২০ | সর্বাধিক পঠিত

অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে সম্মুখ সারির যোদ্ধা ডাক্তাররা

আমার ছেলেটা হওয়ার সময় অপারেশন টেবিলে কিছু একটা সমস্যা হয়েছিল। আমার মনে আছে হঠাৎ বুকে তীব্র ব্যথা শুরু হলো, এতো তীব্র যে আমি দম নিতে পারছিলাম না। মনে হল কেউ যেন হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে আমার হৃদপিন্ডকে- সে চলতে পারছে না। আমি শুনতে পারছিলাম মনিটরের ছন্দময় ‘টি .. টি..’ শব্দ পরিবর্তন হয়ে দ্রুত বাজতে শুরু করলো তার স্বরে ‘ টিটিটিটি’। শুনতে পেলাম আমার ডাক্তার চিৎকার করে বলছেন, ‘অক্সিজেন আনো, অক্সিজেন আনো।’ দেখলাম আমার স্পাইনাল অ্যানেস্থেশিয়া যিনি দিচ্ছিলেন তিনি জোরে জোরে আমার গালে বাড়ি দিচ্ছিলেন আর বলছিলেন ‘শম্পা দেখি তাকাও, তাকাও। জেগে থাকো, শম্পা. শম্পা ..।’ আমার চোখটা তার মুখের উপর স্থির হল, দেখলাম তিনি দরদর করে ঘামছেন, তার কপালের ঘাম বড় বড় ফোঁটা হয়ে গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ সবকিছু স্থির হয়ে গেল। আমার অ্যানেস্থেশিয়ার ডাক্তারের ‘শম্পা শম্পা’ ডাক, মনিটরের টিটিটিটি শব্দ, ওটির হইচই, চিৎকার সব ধীরে ধীরে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যেতে লাগলো। আমি যেন দূর থেকে সব শুনতে পারছিলাম। ধীরে ধীরে সব শাস্ত হয়ে গেল, আমার আর কোনো ব্যথা ছিল না। কী এক অদ্ভুত স্তব্ধতা, স্থিতাবস্থা। সব শান্ত, কী যে শাস্তি! আমি বুঝতে পারলাম আমি সিঙ্ক করে যাচ্ছি, আমার আল্লাহর কাছে যাওয়ার সময় এসেছে। আমি যেতে প্রস্তুত বোধ করলাম।
আমি আমার স্রষ্টার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত বোধ করলাম। কোনো পিছুটান বোধ করলাম না। আমার মেয়েটা এই গল্প শুনলে একটু দুঃখ পায়। কারণ মেয়েটার বয়স তখন সাড়ে ছয় বছর। জানি না, হয়ত মনের গভীরে জানতাম তার একটা খুব যত্নশীল বাবা আছে, তাই হয়ত তাকে নিয়ে আমার দুঃশ্চিন্তা হয়নি। অথবা হয়ত যাওয়ার সময়টাই এমন। শুধু তুমি আর তোমার স্রষ্টার বন্ধন। জানি না। এসব কিছুই আমার মনে আসে নাই তখন। শুধু মনে হয়ে ছিল যে আমার আল্লাহর কাছে যাওয়ার ডাক এসেছে। And I was so ready to go! I was so ready to go and submit myself to my Lord. শুধু শেষ একটা মিনতি ছিল আল্লাহর কাছে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার গর্ভের সন্তানটি তখনো বের হয়নি। যাওয়ার আগে আমি আমার জীবনের শেষ প্রার্থনা করলাম আল্লাহর কাছে, ‘আল্লাহ, শুধু আমার বেবীটা আউট হতে দাও।’ এখন ভাবলে একটু হাসিও পায়। শেষ দোয়াটাও বাংলা, ইংলিশ আর ডাক্তারী শব্দ মিলিয়েই করেছি! আবার ভাবি, মা কী জিনিস!
নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সন্তানের জীবন ভিক্ষা করে সে! এই প্রার্থনার পরে কিছুক্ষণ সব নিস্তব্ধ। এরপরে আর কিছু মনে নেই আমার। আমার ছেলের প্রথম কান্না আমি শুনি নাই অথবা শুনলেও মনে পড়ে না।
গত ১৪ জুন আমার COVID-19-এর PCR test রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। তার একদিন আগে স্বপ্নীল সংক্রমিত হয়, আমাদের বিশ্বাস তার আশপাশের কিছু মানুষের অসচেতনতার কারণে। করোনা সংক্রমণে খুব কম শতাংশ মানুষই মৃত্যু মুখে পতিত হয়। কিন্তু কিছু মানুষ কেন যে হঠাৎ করে খারাপ অবস্থায় চলে যাচ্ছেন তার সঠিক ব্যাখ্যা ডাক্তাররাও শতভাগ আস্থার সাথে দিতে পারছেন না। আমার সমস্ত জীবন-মৃত্যুর চিন্তার সাথে কিভাবে যেন আমার ছেলেটা জড়িয়ে যায়। সূর্য খুব আমার গা ঘেষা ছেলে। ওর বয়স এখন ১৪ বছর। এখনো সারাক্ষণ গা ঘেষেই থাকে। হয়ত ভুল বললাম। এখন আমিই সারাক্ষণ ওর গা ঘেষে থাকি। ১৪ বছরের অভ্যাস এই মহামারিতেও ত্যাগ করতে পারিনি। এই ভুলেই হয়তো আজ আমার ছেলেটাও করোনা পজিটিভ হয়ে গেছে। এই একটাই আমার দুঃখ। হয়ত ডাক্তারের সন্তান হওয়ার মাশুল দিচ্ছে সূর্য। বিশেষ করে যেদিন আমি ও সূর্য করোনা পজিটিভ হওয়ার সংবাদ পেলাম সেদিনই শুনলাম একজন প্রবীণ চিকিৎসককে পিটিয়ে হত্যা করেছে রোগীর স্বজন। সেই খবর শুনে আমার রোগাক্রাস্ত ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার মা হিসেবে খুব দুঃখ হয়েছে।
আপনাদের সকলকে আশ্বস্ত করার জন্য জানাচ্ছি, আমাদের কারো কোনো উপসর্গ নাই। আমি ও স্বপ্নীল আপনাদের দোয়া ও ভালবাসায় অভিভূত। এতো মানুষ তাদের শুভকামনা জানিয়েছেন, সবাইকে ধন্যবাদটুকু দেবার সুযোগ হয়নি। তবে জানবেন ফোন, ফেস বুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ অথবা পরিবারের সদস্যদের কাছে – যারা যেভাবে দোয়া ও শুভ কামনা জানিয়েছেন – এসবই আমাদের গভীরভাবে কৃতজ্ঞ ও আপ্লুত করেছে। কাকরাইল মসজিদে দোয়া হয়েছে, নন্দন কানন বৌদ্ধ বিহারে প্রার্থনা হয়েছে। পূজা মন্ডপে পূজা হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সকলে যার যার মতো করে শুভাশীষ পাঠিয়েছেন। এতিমখানায় দোয়া হয়েছে, আমার দেশের বাড়ি খয়েরপুরের মানুষ অনেকে আমাকে হয়ত দেখেনই নাই কোনো দিন। অথচ, তারাও পবিত্র জুম্মার দিন মসজিদে দোয়া করেছেন।
আমরা কাউকে কিছু বলিনি, মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে করেছেন। রোগীরা স্মরণ করছেন। কেউ আমাকে বলেছেন, আপনি আমার সন্তানের চোখের দৃষ্টি রক্ষা করেছেন, আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করবেন। স্বপ্নীলের রোগীরা কাঁদছেন, বলছেন আমাদের বেঁচে থাকার জন্য হলেও আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করে দিন। আমার মা-বোন বলছেন, বিগত ৩৫-৪০ বছর যোগাযোগ নাই এমন মানুষও তাদের ফোন করছেন। এতো মানুষের ভালবাসা!! এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে। আপনাদের সকলের প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা ও আপনাদের সবার জন্য আমার অপার ভালবাসা। আল্লাহ আপনাদের সবার মঙ্গল করুন। এবারের এই বিশ্ব যুদ্ধে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে সন্মুখ সারির যোদ্ধা ডাক্তাররা। আমি বা স্বপ্নীল ডাক্তার হিসেবে সেই সেবায় যুক্ত ছিলাম যার যার ক্ষেত্রে – এটাই পরিতৃপ্তি, এটাই সন্তুষ্টি। যদি সুস্থ হয়ে ফিরে আসি- আবার একইভাবে আপনাদের সেবা করবো আশা করি, ইনশাআল্লাহ। সবার জন্য শুভ কামনা। দোয়া করবেন আমাদের জন্য, বিশেষ করে আমার বাচ্চাটার জন্য।
লেখক : চিকিৎসক।



Comments

comments



আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১