ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : | সোমবার, ২৮ মে ২০১৮ | প্রিন্ট | 564 বার পঠিত
শুধু বাংলাদেশ নয়; বর্তমান বিশ্ব যে কঠিন সংকটের মুখোমুখি তা হলো মাদকের বিস্তার এবং তারুণ্য-সম্ভাবনাকে নিষ্ফ্ক্রিয় করার এক নিরন্তর ব্যাধি। আমাদের দেশে এই সমস্যা ক্রমাগত এমন বিপুল আকার ধারণ করে চলেছে, তা থেকে পরিত্রাণে বর্তমান সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করে মাদকের বিরুদ্ধে চলতি মাসের ১৫ তারিখ থেকে অত্যধিক প্রশংসনীয় অভিযান শুরু করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে র্যাব ও পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে রীতিমতো সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে ১২ দিনে ৭৫ জন মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। অনেক ব্যক্তি, সংস্থা ও গণমাধ্যম এটিকে অসম যুদ্ধ বা বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর বিরুদ্ধে বক্তব্য-বিবৃতিতে সোচ্চার হয়ে অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন। এর কিছু প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আজকের এই নিবন্ধের উপস্থাপনা।
এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সর্বক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি অর্জন করে বিশ্ব-পরিমণ্ডলে বিশেষ মর্যাদায় সমাসীন। ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশের আপামর মানব সম্পদসহ সব উন্নয়ন-উৎসকে পরিপূর্ণভাবে উপযোগী ও ব্যবহারযোগ্য করার নতুন পন্থা উদ্ভাবন করা হচ্ছে, ঠিক এই সময়ে তরুণ প্রজন্মের মাদকাসক্ত হওয়ার বিষয়টি অবশ্যই সর্বাধিক গুরুত্ব বহন করে। প্রায় ৬ কোটি এই তারুণ্য শক্তিকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও দেশপ্রেমে শানিত করে যথাযথ অর্থে সুশিক্ষিত, সুনাগরিক, আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে জাতি ব্যর্থ হলে উল্লিখিত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ অবশ্যই চরম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।
পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার ও স্বর্ণালি ত্রিভুজ প্রভাবিত ভৌগোলিক রাষ্ট্রকাঠামোর কারণে বাংলাদেশ হয়ে পড়েছে মাদকের এক বড় সংক্রমণ কেন্দ্র। এ দেশে মাদকের অনুপ্রবেশ শুধু ঘটছে না, এটি আবার এখান থেকে নানা উপায়ে অন্য দেশে চালান করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও তৈরি হয়েছে। মূলত মাদকের প্রতি আসক্ত হওয়ার বিষয়কে একদিকে বিপথগামিতা, অন্যদিকে সামাজিক সমস্যা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের আসক্ত ব্যক্তিকে বিপথগামী হিসেবে গণ্য করে এর বিস্তার ও বিপন্নতাকে সামাজিক সমস্যা হিসেবে মূল্যায়ন করাই হবে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিপথগামিতা এমন এক ধরনের মনোভাব, যা মনোবিজ্ঞানী গর্ডেন অলপোর্টের মতে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত মানসিক ও মস্তিস্কের তৎপরতা, যা সব বস্তু ও অবস্থার প্রতি ওই ব্যক্তির প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
মনোবিজ্ঞানী থার্স্টন, লিকার্ট, বোগার্ডাস, গুটমান, এডওয়ার্ড, কিলপ্যাট্রিক প্রমুখ বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে মনোভাব মানক বা পরিমাপ পদ্ধতির ব্যাখ্যায় মনোভাবের নানা মাত্রিকতা, প্রকৃতি ও পরিধি সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেছেন। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টন এসব বিপথগামিতাকে ‘ব্যতিক্রমী ক্রিয়া’ আখ্যায়িত করে ‘প্রথাগত রীতির অনুসরণ’, ‘নব্যপ্রথা প্রবর্তন’, ‘আচারপরায়ণতা’, ‘পশ্চাৎমুখিতা’, ‘বিদ্রোহ’ ইত্যাদি ধরনের লক্ষ্য ও পন্থা প্রবর্তনের উদ্যোগকে একটি প্যারাডাইম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মাদকের প্রতি আসক্তি ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের কাছে ক্ষতিকর প্রমাণিত জেনেও কেন মাদকের প্রতি মানুষ আসক্ত হয়ে পড়ে, এর কিছু সাধারণ ধারণা কমবেশি সবারই জানা।
সমাজবিজ্ঞানী পরিমলভূষণ কর মনে করেন, এটির প্রধান কারণ মনস্তাত্ত্বিক অর্থাৎ মানসিক চাপ হ্রাস, হতাশা থেকে সাময়িক মুক্তি, একঘেয়েমি অবস্থা কাটিয়ে ওঠা, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার ও সুখানুভূতি লাভ করা। দ্বিতীয় কারণ হলো সামাজিক। অর্থাৎ প্রফেসর সুদারল্যান্ডের মতে, ‘সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’ তথা সমাজের বিভিন্ন অপগোষ্ঠী বা বন্ধুর সঙ্গে মেলামেশা ও বিভিন্ন কৌতূহল নিবারণের মাধ্যমে ধূমপান থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, যা থেকে বেরিয়ে আসা খুবই কঠিন। আমাদের জানা উচিত, প্রাথমিক সংস্কৃতিকরণ সামাজিক প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ, যে পর্যায়ে সামাজিক নিয়ম, রীতিনীতি, প্রথা-আচার, মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত শিশু সত্য-সুন্দর ও স্বাভাবিক গ্রহণযোগ্য ধারাকে গ্রহণ করে।
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নিয়মের মধ্যে অভ্যস্ত হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গঠনের লক্ষ্যেই মানব সমাজ পরিচালিত। এর অন্যথায় নানামুখী শাস্তির বিধানও প্রচলিত। একজন ব্যক্তির ‘স্বাভাবিক অধিকার’ বলে প্রচলিত বিষয়টি স্বীয় জীবনকে রক্ষার অধিকারকে প্রাধান্য দেয়। এটি অনস্বীকার্য যে, নানা আইন ও প্রথা দ্বারা ব্যক্তির প্রাথমিক অধিকার সীমিতকরণে সমাজের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। কারণ একটি সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠা ও একে টিকিয়ে রাখতে নানাবিধ বাধা-নিষেধ অনিবার্য। এ সমাজে ক্ষমতা, অর্থ-বিত্ত, প্রতিপত্তি, অন্যের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা আদিকাল থেকেই সম্প্রসারিত। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে পুরো সমাজকে পঙ্গু বা কলুষিত করার প্রভূত উদাহরণ বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক। আদর্শহীনতা ও নৈতিকতা-বিবর্জিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় বরাবরই অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত, অগ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই ঘৃণ্য।
সামাজিক জীব হিসেবে একে অপরের সহযোগিতা ছাড়া সুস্থ জীবনযাপন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য উৎকৃষ্ট মাধ্যম হচ্ছে প্রকাশভঙ্গি। মনুষ্যত্ব বিকাশের সাবলীল পথে মানুষ পরিচয়ে কেউ যদি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাজ-অগ্রসরমানতায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, তাহলে সেসব অমানুষকে হিংস্র পশুর মতো নিধন করে সমাজের পবিত্রতা রক্ষা করাই যে কোনো রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে উল্লিখিত ‘মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়’ এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
প্রচলিত আইনের বিশ্নেষণ এবং প্রয়োগের ফাঁকে বর্বর ও অসভ্য অপরাধীরা পার পেয়ে যায় নানাবিধ প্রভাবের কারণেই। এসব সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনৈতিক প্রভাব জাতির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগোনোর পথকে রুদ্ধ করে অন্ধকারের গহ্বরে ঠেলে দেবে- সেটি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত হতে পারে না। সভ্যতার শুরু থেকেই এ ধরনের অপরাধমুক্ত হওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হয়। এ বিষয়টি অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত যে, অবৈধ অস্ত্র হাতে অবৈধ কর্ম সম্পাদনের জন্য দেশ ও দেশবাসীর নিরাপত্তা রক্ষার কাজে অথবা বিশেষ অপরাধ নিরোধকল্পে কোনো অভিযানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হলে অপরাধীর আক্রমণকে প্রতিহত করে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে বর্তায়।
আজকে বিশ্বে কথিত ধনী-সভ্য-উন্নত-অত্যন্ত প্রতাপশালী দেশগুলো নির্বিচারে ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে নানা অমূলক কারণ দেখিয়ে যেসব হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করছে, কথিত প্রতিবাদকারীরা এদের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান না নিয়ে বাংলাদেশে কতিপয় সন্ত্রাসী ও অপরাধী নিহত হওয়ার ঘটনাকে যেভাবে বিচারবহির্ভূত বা অন্যান্য বিরূপ বিশেষণে উপস্থাপন করছেন, এদের উদ্দেশ্য ও ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যে অনেকের মাঝে যে সংশয় ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে, তাও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। অবশ্যই যে কোনো হত্যাকাণ্ড গর্হিত এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অধিকতর ঘৃণ্য এবং নিন্দিত- এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণের কোনো অবকাশ নেই। তবে আত্মরক্ষার স্বার্থে সংঘটিত কোনো অপরাধীর নিহত হওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একতরফাভাবে দোষারোপ করা কতটুকু যৌক্তিক, সেটিও ভেবে দেখা দরকার।
জাগ্রত বিবেকের উপলব্ধিতে এটি স্পষ্ট যে, এই জাতি-রাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মকে সুপথে পরিচালনা ও বিপথগামিতা থেকে তাদের রক্ষায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে অবশ্যই দায়িত্ববান হতে হবে। সচেতন ও বস্তুনিষ্ঠ নৈর্ব্যক্তিক বিচারে অপরাধী যেই হোক না কেন, দলমত-বিত্ত-প্রভাব-পেশাকে গুরুত্ব না দিয়ে অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সঙ্গে সঙ্গে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ এবং এই প্রবেশপথ কার্যকরভাবে বন্ধে ব্যর্থ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। মাদ্রাসা-স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পাঞ্চল, যানবাহন টার্মিনাল, বস্তিসহ সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে শিক্ষক, অভিভাবকসহ সামাজিক-রাজনৈতিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে ব্যাপক জনসচেতনমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।
নগর, শহর, গ্রাম- প্রতিটি অঞ্চলে যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় কার্যকর কমিটি গঠনের মাধ্যমে মাদক ব্যবসার মদদদাতা বা পৃষ্ঠপোষক, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের নিরপেক্ষ তালিকা প্রস্তুতকরণ এবং এদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন কারও ব্যক্তিগত আক্রোশ বা অন্য কোনো কারণে এই তালিকাভুক্ত না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষা, শিল্প ও সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরামর্শ দান, নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং মাদকসেবীদের নান্দনিক দৃষ্টিতে সমাজ, পরিবার, ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের শ্রদ্ধা-স্নেহ-ভালোবাসায় সিক্ত করে তাদেরকে আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মবিশ্বাসী হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। তাহলেই মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানকে অর্থবহ ও ফলপ্রসূ করা যাবে।
শিক্ষাবিদ, উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
Posted ৮:৫৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৮ মে ২০১৮
America News Agency (ANA) | Payel