| রবিবার, ০৮ এপ্রিল ২০১৮ | প্রিন্ট | 510 বার পঠিত
শিক্ষা ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনেকখানি নির্ভর করে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ওপর। সুতরাং শিক্ষাক্ষেত্রে জাতীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অনেক গুরুত্বর্পূণ। শিক্ষকের পাঠদান এবং শিক্ষার্থীর পাঠগ্রহণ কতটুকু ফলপ্রসূ হয় তা নির্ভর করে শ্রেণীকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ওপর। আর এ বিষয়টি বেশি প্রভাবিত হয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সময় শিক্ষকের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ তথা শিক্ষকের ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ ও অনুকরণ করে। তাদের কাছে শিক্ষক মানেই একজন স্বপ্নদ্রষ্টা।
শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষকের এই অবস্থান শিক্ষকের জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু বর্তমানে আমাদেরই হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। এ ধরনের শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র কয়েকজন, কিন্তু এর দায়ভার নিতে হচ্ছে সমগ্র শিক্ষক সমাজকে।
তবে এ ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে শিক্ষকের ওপর দোষ চাপানো সমীচীন নয়। কেননা শিক্ষকরা যে টাকা বেতন পান তা দিয়ে আর যাই হোক সাবলীলভাবে জীবনযাপন সম্ভব নয়। ন্যূনতম চাহিদা পূরণের জন্য যে আর্থিক সঙ্গতি থাকা প্রয়োজন, তা যখন ব্যাহত হয় তখনই তার প্রভাব পড়ে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ওপর।
আগেকার দিনে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ‘জগ-মগ’ তত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অর্থাৎ শিক্ষক ছিলেন ‘জগ’ আর শিক্ষার্থী ছিল ‘মগ’। শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে জগের ভূমিকায় জ্ঞান ঢালতেন আর শিক্ষার্থী মগের ভূমিকায় জ্ঞান গ্রহণ করত। কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে। এখনকার শিক্ষা কার্যক্রম হল অংশগ্রহণমূলক। আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় না থাকলে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের আরেকটি পর্যায় হল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তবে এ বন্ধুত্ব এমন নয় যে, একজন শিক্ষার্থী শিক্ষকের কাঁধে হাত দিয়ে বলবে, ‘চলো বন্ধু ঘুরে আসি’। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বলতে বোঝাতে চাচ্ছি শিক্ষার্থীর জানার ক্ষেত্র বা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা যাতে শিক্ষার্থী নির্দ্বিধায় এবং নিঃসংকোচে শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করতে পারে। অর্থাৎ আমরা শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর সঙ্গে মিশব তবে মিশে যাব না।
ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের ওপরও নির্ভর করে। একজন শিক্ষককে অবশ্যই শিক্ষার্থীর মানসিক চাহিদা অনুমান করে পাঠদানে নিয়োজিত হতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা বয়ঃসন্ধিকালের মধ্যেই থাকে। আর এ সময়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনজনিত আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তা আমলে নিয়েই শিক্ষককে পাঠদান করতে হবে। শিক্ষক কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, শিক্ষার্থীকে নীতি-নৈতিকতারও শিক্ষা দিয়ে থাকেন। ফলে অনেক শিক্ষকই শিক্ষার্থীর কাছে আদর্শ ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে পারেন।
প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক অনেকটা স্পর্শকাতর। পিতৃস্নেহ বা মাতৃস্নেহ না পেলে শিক্ষার্থী পাঠে মনোযোগী হবে না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের আচরণ শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়মুখী করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ স্তরে শিক্ষার্থীর আবেগ কার্যকর থাকে অনেক বেশি। তাই শিক্ষকের কোনো কথাবার্তা কিংবা আচরণ তার মনঃপূত না হলে সে বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে উঠতে পারে।
একজন শিক্ষক যেমন পথপ্রদর্শক, তেমনি তিনি একজন অভিভাবক, একজন মনোবিজ্ঞানী কিংবা একজন স্বপ্নদ্রষ্টা এবং একজন ভালো মানুষ গড়ার কারিগরও বটে।
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন : সিনিয়র শিক্ষক, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ; ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত
Posted ৮:৫১ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৮ এপ্রিল ২০১৮
America News Agency (ANA) | Payel