শনিবার ২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

>>

ঠিকানা কী দিতে চেয়েছি, কী দিলাম –

  |   সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮   |   প্রিন্ট   |   499 বার পঠিত

ঠিকানা কী দিতে চেয়েছি, কী দিলাম –

১৯৯০ থেকে ২০১৮। কালের গতিপথে এরই মাঝে কীভাবে যেন চলে গেছে ২৮টি বছর! এই সময়ে হাডসন-বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে বয়ে গেছে বহু পানি। সময়ের স্রোতধারায় বিংশ শতাব্দী গুডবাই জানিয়ে একবিংশ শতাব্দীও তার দুই দশক অতিক্রমের পথে। কিন্তু মনে হয়, এই তো সেদিন বসন্তের এক শুভক্ষণে ‘ঠিকানা’র জন্ম হলো! হাঁটি হাঁটি পা পা করে ২৮টি বসন্ত পাড়ি দিয়ে ‘ঠিকানা’ তার শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে আজ উনত্রিশের ভরা যৌবনে দাঁড়িয়ে। পরবাসী সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-সাধ, ভালোবাসা-বিশ্বাস আর আস্থা-নির্ভরতা অর্জন করে ঠিকানা আজও তারুণ্যদীপ্ত। সময়ের পরিক্রমায় হাজারো মানুষের ভালো লাগা, হাসি-কান্নার স্মৃতি বয়ে চলা ‘ঠিকানা’ উত্তর আমেরিকা তথা সারা বিশেষ আজ একটি সফল ব্র্যান্ডের নাম।
ঠিকানার ২৯ বছরে পা রাখার শুভক্ষণে লিখতে বসার পর তাই স্মৃতিরা এসে ভিড় জমায়। নিজের অজান্তেই টেনে নিয়ে যায় তিন দশক পেছনে। এই সব স্মৃতির কিছু সুখের, কিছু বেদনার, কিছু উপভোগের, কিছু হতাশার, কিছু পাওয়ার আবার কিছু না-পাওয়ার। নিজের মানসপটে ভেসে ওঠে হিসাববিজ্ঞানের খতিয়ান, জাবেদা, রেওয়ামিল। চূড়ান্ত হিসাব করতে গিয়ে মনে মনে আওড়াই, নিজে কী পেলাম আর মানুষের জন্য কী করতে পারলাম। জটিল এই সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় এ জীবনে পেয়েছি অনেক কিছুই সবচেয়ে বড় পাওয়া মানুষের ভালোবাসা। আর হারিয়েছি কী মোটাদাগে বললে নিজ স্বাস্থ্য আর সম্পদ। পক্ষান্তরে প্রবাসী বা দেশবাসীকে কী দিতে পেরেছি, কতটাই-বা দিতে পেরেছি, তারও অনুপুঙ্খ একটা হিসেব করা প্রয়োজন। নিজের কথা বলার সুযোগ সব সময় পাওয়া যায় না, ঠিকানার এই জন্মলগ্নকেই তাই বেছে নিলাম নিজের ফিরিস্তি বলার হাতিয়ার রূপে।

আমেরিকায় আমার আগমন আর ঠিকানা প্রতিষ্ঠার সাতকাহন বর্ণনার আগে পাঠককে নিয়ে যাচ্ছি আরেকটু পেছনে। ভর্তি হয়েছি ঢাকায় একটি কলেজে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি পূর্ণ উদ্যমে। ছাত্ররাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে কলেজ আঙিনাসহ রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছি। কিন্তু এই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। রাজনীতির কিছু জটিল মারপ্যাঁচে তথা ভয়াবহ চাপের মুখে ছেড়ে আসতে বাধ্য হই প্রিয় মাতৃভূমি। বলতে পারেন, অনেকটা প্রাণ বাঁচানো আর উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের মুহুমুর্হু তাড়নায় নিজ দেশকে পিঠ দেখিয়ে অজানা গন্তব্যে ছুটে চলি। কয়েক মাস ঘোরাঘুরি শেষে ঠাঁই মেলে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে। কথায় আছেÑঢেঁকি স্বর্গে গেলেও নাকি ধান ভানে! দেশ আমাকে ছাড়লেও রাজনীতি ছাড়েনি। রাজনীতির ঘোর নেশার মায়াজালে পড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি জার্মানির এক শহর থেকে আরেক শহরে। এরই মধ্যে কেটে গেছে ৩ বছরাধিক কাল। কিন্তু সেখানেও থিতু হতে পারলাম না। একদিন (সম্ভবত ১৯৮০ সালে) দেশ থেকে বাবার ফোন। কুশলাদি শেষে হুকুম আমেরিকায় চলে যাওয়ার। গুরুজনের হুকুম তামিল করতে গিয়ে আমেরিকার বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হওয়ার আবেদন করি। অবশেষে নিউইয়র্কের একটি কলেজ থেকে অফার মেলে। পেয়ে যাই স্টুডেন্ট ভিসা। বিদায় জার্মানি!

১৯৮১ সালে পা রাখি বিশ্ব রাজধানীখ্যাত স্বপ্নের শহর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে নিউইয়র্কে আসা, শুরুতেই সেখানে হোঁচট। বহু দেশের বহু জাতিসত্তার বহু ভাষাভাষী, বহু সংস্কৃতি আর বহু ধর্ম-বর্ণের আশ্চর্য এই শহরে আমি যেন অকূল দরিয়ায় কূলহারা এক মাঝি! অচেনা দেশ, অচেনা মানুষ, অচেনা ভাষার ভিড়ে নিজের অস্তিত্বই যেন বিলীন হওয়ার উপক্রম। সত্তর কিংবা আশির দশকে যারা বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় পা দিয়েছেন, তারা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন কী অবর্ণনীয় প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তাদের আমেরিকার বুকে ঠাঁই নিতে হয়েছে। তখনকার সময়ে নিজেকে বাংলাদেশি বললে ভিনদেশিরা একবাক্যে চিনত না। অনেকেই বাংলাদেশকে মনে করত ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হিসেবে। অনেক কষ্টেসৃষ্টে বোঝাতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে তারা চিহ্নিত করত ক্ষুধা-দারিদ্র্য, খরা-জরা, ঘূর্ণিঝড়-সাইক্লোনে বিধ্বস্ত এক ছোট্ট জনপদ হিসেবে। তখন নিজেকে কী যে অসহায় লাগত, তা কেবল ভুক্তভোগী বাংলাদেশি প্রবাসীদের পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব। সময়ের পরিক্রমায় আর ওই সময়ের প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানামুখী ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণে আজ আর সেই অবস্থা নেই। এখন যারা বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় আসেন, তাদের সেই কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়াতে হয় না, তাদের জন্য পূর্বসূরি বিছিয়ে রাখেন লাল গালিচা। মনে হয়, তারা যেন শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন! তাদের এখন আর তিন ঘাট ঘুরিয়ে ভিনদেশিদের কাছে নিজেদের পরিচয় দিতে হয় না, বাংলাদেশি বললেই একবাক্যে যে কেউ তাদের শনাক্ত করতে পারে। যা-ই হোক, নিউইয়র্কে একসময়কার কপর্দকহীন এই আমি পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেতে শুরু করি কঠিন জীবন-সংগ্রাম। সততা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে একসময় অনুভব করি, পায়ের নিচে বেশ শক্ত মাটি। ২-৩ বছরের মাথায় সহোদরদের সহযোগিতায় নিজ প্রচেষ্টায় চার-চারটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা লাভ করি। তারপর থেকে আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, জোর কদমে কেবল এগিয়েই চলেছি।

শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা নয়, পাশাপাশি কমিউনিটির কল্যাণে একের পর এক কর্মসূচি হাতে নিই, বাস্তবায়নও করে চলি। যদিও তখন এ দেশে বাংলাদেশিদের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা, তবু তাদের নিয়েই শুরু করি পথচলা। নিজের পাশাপাশি তাদের অবস্থানও কীভাবে সুসংহত করা যায়, তা আমাকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলত। ভাবতে ভাবতে মাথায় আসে, বিচ্ছিন্নভাবে সবার অবস্থান সুসংহত করা আসলেই কঠিন, এর জন্য দরকার একটি ফ্ল্যাটফর্মের। যেই ভাবা সেই কাজ। প্রবাসীদের জীবনমানের উন্নয়ন, তাদের কর্মসংস্থান, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, ইমিগ্রেশন এবং প্রবাসী নব্য কমিউনিটির মধ্যে সেতুবন্ধ রচনার উদ্যোগ গ্রহণ করি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র নেতৃত্বদানকারী সংগঠনÑবাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা। দায়িত্ব নিই সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদকের। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করি জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন, যার সাধারণ সম্পাদকের পদটিও আমাকেই গ্রহণ করতে হয়। এই দুটি সংগঠনের মাধ্যমে নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা এক ছাতার নিচে আসতে সক্ষম হন। অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে আর দশটা দেশের মতো আমেরিকায় সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চলতে থাকে নানা কর্মসূচি। আশির দশকের প্রথমার্ধে ও মাঝামাঝিতে শত শত প্রবাসীর সমন্বয়ে প্রথম বনভোজন করা, প্রথম খোলা আকাশের নিচে বৈশাখী মেলা, বাংলাদেশ থেকে জাতীয় তারকা এনে প্রথম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে মূলধারার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে দেনদরবার করা, বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনার সংগঠিত করার মাধ্যমে আমরা আমেরিকার বুকে একখ- বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হই। পাশাপাশি বর্ণবাদী হামলার প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ানো এবং অবৈধ অভিবাসীদের সহযোগিতা ও নানা পরামর্শ দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যক্রম অব্যাহত রাখি। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকার অন্যতম উপদেষ্টা ডা. খন্দকার আলমগীর ও প্রবাসের অতি পরিচিত মুখ লাকি খালেকের প্রস্তাবে প্রথম শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিই। নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড সিটির জন এফ ম্যারি পার্কে ভাষাশহীদদের স্মরণে প্রথমবারের মতো অস্থায়ী ‘শহীদ মিনার’ নির্মাণ করা হয়। ১৯৮৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ কণ্ঠে ধারণ করে আমার নেৃতত্বে দেড়-দুই শতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু প্রভাতফেরি করে সেখানে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করি। আজও মনে পড়ে, সেদিন মিছিলে গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে সবার আগে আগে চলেছেন ফেরদৌস খান। প্রথমবারের মতো প্রবাসে প্রভাতফেরি করে উপস্থিত সবাই ছিলেন দারুণভাবে উদ্দীপ্ত। প্রভাতফেরি শেষে সেদিন আমারই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানÑস্কাই লাইন রেস্তোরাঁয় আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। সেখানে অনেকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, ডা. খন্দকার আলমগীর, প্রফেসর ইলিয়াস কবির, বাংলাদেশ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জাকারিয়া খান, সিপিএ আবদুল মালেক, লাকি খালেকসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

এবার আসি ঠিকানার প্রসঙ্গে। প্রবাসী কমিউনিটিকে আরো বৃহৎ পরিসরে সেবাদান, দেশকে ভুলে না যাওয়া, বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাসীদের মধ্যে আরো ঐক্য, তাদের মেধা-যোগ্যতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি আদান-প্রদানের মাধ্যমে কমিউনিটি ও দেশকে সহযোগিতা করাÑসেসব চিন্তা থেকেই মূলত ঠিকানা প্রকাশের চিন্তা আমার মাথায় আসে। ১৯৯০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হলেও এর ভ্রুণ অঙ্কুরিত হয় দুই বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেই সময়ে বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা কর্তৃক ‘ঠিকানা’ নামে একটি সংকলনও আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। বিদেশ বিভূঁইয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলো নাড়িপোঁতা দেশ এবং তাদের আত্মীয়স্বজনের কথা জানতে চায়। তাদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টিকে মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিই পত্রিকা প্রকাশের। পরিবারের অন্যান্য সদস্যের পাশাপাশি বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকার তৎকালীন সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক কৌশিক আহমদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়। পরবর্তী সময়ে সিলেট থেকে সদ্যাগত সাংবাদিক মাহবুবুর রহমানও আমাদের সঙ্গে যোগ দিলে নতুন করে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। ১৯৯০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সম্পূর্ণ অজানা এক ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে প্রকাশিত হলো ঠিকানা, লং আইল্যান্ড সিটির স্কাইলাইন রেস্তোরাঁর ছোট্ট একটি কক্ষ থেকে। উল্লেখ্য, ১৭৮০ সালে ভারতের কলকাতা থেকে অগাস্টাস হিকির সম্পাদনায় ‘বেঙ্গল গেজেট’ নামে প্রথম বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এর ২০০ বছর পর উত্তর আমেরিকায় আমার সম্পাদনায় প্রথম বাংলা নিয়মিত সাপ্তাহিক হিসেবে ‘ঠিকানা’ আত্মপ্রকাশ করে।
কিন্তু ঠিকানা প্রকাশ করতে গিয়ে পদে পদে যেসব দুর্ভোগ আর ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিতে হয়েছে, তা এককথায় বর্ণনাতীত। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিস্তারের ফলে ফেসবুক, ইন্টারনেট, স্কাইপ, ম্যাসেঞ্জার আর ডিশ নেটওয়ার্কের কল্যাণে সারা বিশ্ব আজ মানুষের হাতের মুঠোয়। এখন ঘরে বসেই সারা বিশ্বে ঘটে চলা যেকোনো সংবাদ মুহূর্তের মধ্যেই পাওয়া যায়। কিন্তু আজ থেকে ২৮ বছর আগে এসব কল্পনা করাও ছিল বিলাসিতা! ফেসবুক-টুইটার দূরে থাক তখনকার সময়ে আজকের মতো না ছিল কম্পিউটার, না ছিল ইন্টারনেট বা ফ্যাক্স কিংবা টেলিফোন। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রতি সপ্তাহে কীভাবে ঠিকানা পাঠকের হাতে পৌঁছে দিয়েছি, সেটা ভাবলে আজও গা শিউরে ওঠে। সেই সময়কার প্রবাসীরা নিশ্চয় জানেন, আমেরিকা থেকে দেশে কারো সঙ্গে কথা বলতে হলে টেলিফোন বিভাগে ট্রাঙ্ক কল বুকিং দিতে হতো। এরপর তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা! একটা সময়ে এসে মিলত কাক্সিক্ষত লাইন। তারপরও ছিল অনেক ল্যাঠা! ফোনে ঢাকাস্থ প্রতিনিধি নির্বাচিত কিছু সংবাদ রেডিওর মতো পাঠ করে যেতেন, তা থেকে অন্য কেউ কাগজে সেটা লিপিবদ্ধ করতেন। তারপর কম্পিউটারে কম্পোজ! সে আরেক ইতিহাস! তখনো নিউইয়র্কে এমন কেউ ছিলেন না, যিনি বাংলায় কম্পোজ করতে পারেন। তাই সব লেখা একত্র করে এক্সপ্রেস মেইলে পাঠানো হতো লন্ডনেÑসুরমা পত্রিকায়। সেখান থেকে ফিরতি মেইলে আসত ট্রেসিং। পর পর চার সপ্তাহ এভাবে উদ্্গ্রীব পাঠকের হাতে নিয়মিত পৌঁছাই ঠিকানা। কিন্তু আর যা-ই হোক, এভাবে ঢাকা-নিউইয়র্ক-লন্ডন টানাহেঁচড়া করে পত্রিকা করা যায় না। কম্পোজের ব্যবস্থা নিউইয়র্কেই করতে হবে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব? যোগাযোগ করি বাংলাদেশে আদেল কম্পিউটারের একমাত্র পরিবেশক, বর্তমানে প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের সঙ্গে। তাঁকে আমাদের সমস্যাটির কথা জানালে তিনি বলেন, আফরোজা নামে তাঁর প্রথম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী নিউইয়র্কে আছে, তাকে দিয়ে কাজটি করানো সম্ভব। যোগাযোগ হয় আফরোজার সঙ্গে। তিনি আমাদের প্রস্তাবে রাজি হন। কেনা হয় কম্পোজের জন্য কম্পিউটার ও প্রিন্টার। তার পর থেকে সুরমার বদলে ঠিকানা অফিসেই কম্পোজের কাজও চলতে থাকে। এত প্রতিকূলতা, এত পরিশ্রম শেষে ঠিকানা যখন প্রতি বুধবার নিয়মিতভাবে পাঠকের হাতে যেত, তখন এক নিমেষে আমাদের সকল কষ্ট উবে যেত। কারণ প্রতি সপ্তাহেই পাঠকেরা পত্রিকাটিকে হট কেকের মতো কিনে নিতেন, যা বিগত ২৮ বছর যাবৎ অব্যাহত রয়েছে। ঠিকানার প্রতি পাঠকের এই ভালোবাসা আমাকে ঋণভারে জর্জরিত করে, আবেগে আপ্লুত করে। প্রেরণা পাই ঠিকানাকে আরো এগিয়ে নেওয়ার, পাঠককে প্রতিনিয়ত নতুনত্ব উপহার দেওয়ার। পাঠকের এই ভালোবাসাকে পুঁজি করেই স্বপ্ন দেখি, যত দিন রবে পদ্মা মেঘনা যমুনা বহমান, তত দিন আমেরিকার বুকে শির উঁচু করে ঠিকানা থাকবে চলমান।

লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছিলাম আমার রাজনীতিপ্রীতির কথা। আমেরিকায় বসেও দেশের রাজনীতির আগাপাছতলা পর্যবেক্ষণ করছিলাম। পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য সামান্য কিছু করতে পারার তৃপ্তি থাকলে দেশবাসীর জন্য কিছু করার তাড়নাও আমাকে কুড়ে কুড়ে দংশন করছিল। সেই তাড়না থেকেই রাজনীতির মাধ্যমে দেশসেবার মহান ব্রত নিয়ে ১৯৯৩ সালে দেশে ফিরে যাই। আমার পিতৃভূমি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ায় গিয়ে নিজের আকাক্সক্ষার কথা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও এলাকাবাসীর কাছে নিবেদন করি। এলাকাবাসীও আমাকে বিমুখ করেননি। তাদের ভালোবাসা আর মূল্যবান ভোট পেয়ে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও আমি ভুলে যাইনি আমার প্রিয় প্রবাসীদের। শুধু দেশ বা এলাকার জন্যই আমি কাজ করিনি, প্রবাসীদের উন্নয়নেও নিজেকে নিয়োজিত করি। জাতীয় সংসদের দুবারের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে একান্ত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় প্রবাসীদের কল্যাণে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, আমেরিকায় বাংলাদেশ বিমানের সার্ভিস, সোনালি এক্সচেঞ্জ চালু করতে সক্ষম হই। এছাড়া প্রবাসীদের কল্যাণে ঢাকায় পূর্বাচল আবাসিক এলাকায় ৩৩০০ প্লট, বারিধারায় পাঁচ শতাধিক ফ্ল্যাট, ইস্কাটনে ১৮ তলা ভবনে প্রস্তাবিত ওয়ান স্টপ সেন্টারে প্রবাসী ডেস্ক স্থাপনে সরকারকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হই। সংসদ সদস্য হয়ে এলাকাবাসী ও প্রিয় প্রবাসীদের কল্যাণের চিন্তা বাদ দিয়ে আমি কখনোই নিজের ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টা করিনি। সে গল্প না হয় আজ থাক, ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইল।

প্রিয় পাঠক, শুরু করেছিলাম ঠিকানার স্মৃতিচারণা দিয়ে। কিন্তু কখন যে হারিয়ে গেছি সোনালি অতীতে, তা টেরই পাইনি। আশা করি, আমার এ ত্রুটি আপনারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। যাক, আবারো ঠিকানা প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ঠিকানা প্রবাসীদের কী দিয়েছেÑতার বিচার আমি নই, করবেন আপনারাই। আর আমি কী পেয়েছি, সেটা আগেই বলেছিÑআপনাদের অফুরন্ত ভালোবাসা। কিন্তু কী হারিয়েছি, সেটাও উল্লেখ করেছি। শুরুর সংকট বাদ দিলেও পরবর্তী সময়েও যে ঠিকানার পথ একেবারে কুসুমাস্তীর্ণ ছিল, তা নয়। ঠিকানা বরাবরই সকল দল-মত, শ্রেণি-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠ ও সত্য সংবাদ প্রকাশ করে গেছে। এটা করতে গিয়ে কারও কারও স্বার্থের হানি ঘটেছে। তাই দীর্ঘ তিন দশকে ঠিকানা বারবার প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেÑকখনো আর্থিক, কখনো-বা নিন্দুকদের চোখরাঙানি। আর এসব প্রতিবন্ধকতা আমরা মোকাবিলা করেছি ধৈর্যের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, আপস করে নয়। আর আর্থিক সংকটের মুহূর্তে আমার প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য ও লাভজনক বাকি ৪ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অর্থ ঠিকানার পেছনে অকাতরে ব্যয় করেছি। এর ফলে আজ ওই লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো একটা সময়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। কিন্তু আর্থিক কিংবা শারীরিক ও মানসিকভাবে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। আমি চেয়েছিলাম ঠিকানা হবে প্রবাসীদের মুখপত্র। আপনারা সেটা প্রমাণ করেছেন। আমেরিকায় বর্তমানে চালু থাকা আরো ১০-১২টি বাংলা পত্রিকা থাকা সত্ত্বেও আপনারা ঠিকানাকেই নিজেদের ঠিকানা করে নিয়েছেন। এটাই আমার বড় সার্থকতা। শত কষ্টের বেদনা সয়েই বিপুল আনন্দের অনুভব। কথা দিচ্ছি ঠিকানা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তার লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত হবে না।
লেখার শেষে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি সহোদর সাঈদ-উর-রবকে। কারণ, দেশে রাজনৈতিক কর্মকা-ে ব্যস্ত হয়ে ওঠার কারণে একপর্যায়ে আমি ঠিকানার সম্পাদনার দায়িত্ব ছেড়ে দিই। সেই সময়টি থেকে জনাব রব ঠিকানার অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে গিয়েছেন। সাঈদ-উর-রব এর নেতৃত্বে ঠিকানাকে যারা প্রবাসী বাংলাদেশিদের নয়নমণিতে পরিণত করতে কাজ করছেন, তাঁরা হলেন মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, লাবলু আনসার, জাবেদ খসরু, মঞ্জুর হোসেন, মিজানুর রহমান, শামসুল হক, এম এম আহাদ ও মো. মাসুদুর রহমান প্রমুখ।

এছাড়া বিশিষ্ট সাংবাদিক আশরাফ খানের নেতৃত্বে ঢাকা অফিসে নিভৃতে ঠিকানার জন্য শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী, মোস্তফা কামাল, বিনয় রায়, মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম, আকমল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. মাহমুদুল আলম, মামুনুর রশীদ মিতুল, কামরুল হক, এস এম কামরুজ্জামান, গিয়াস উদ্দিন প্রমুখ।
সর্বশেষ তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা, শুরু থেকে যাঁদের অকৃত্রিম সহযোগিতা না পেলে ঠিকানার হয়তো এত দূর আসা সম্ভব হতো না। তাঁরা হলেন কৌশিক আহমেদ (সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাঙালি); মাহবুবুর রহমান (প্রবীণ সাংবাদিক), মতিউর রহমান চৌধুরী (প্রধান সম্পাদক, মানবজমিন ও ঠিকানার তৎকালীন ঢাকা ব্যুরো চিফ); শওকত রচি; আবদুল মালেক; শেখ শাহনেয়াজ; রেজাউল হাসান বাবুল; আবু তাহের (সম্পাদক, বাংলা পত্রিকা); মিজানুর রহমান খান (সাংবাদিক, প্রথম আলো); আমির খসরু (সাংবাদিক), শহীদুল আজম (সাংবাদিক এটিএন), মাহফুজুর রহমান (সম্পাদক, বর্ণমালা); ফাহমিদা হোসাইন, শিকদার হুমায়ুন কবির; আশরাফুল হাসান বুলবুল; আনিসুল কবির জাসির; আউয়াল প্রমুখ। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, যারা ঠিকানায় দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন আজ তারা পরপারে। তাদের অন্যতম মরহুম আবদুল বাসিত, আনোয়ারুল হক, আবদুর রৌফ খান মিষ্ঠু ও আতাউর রহমান। ঠিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, আবার অনেকে এখনো আছেন। কেউ কেউ ঠিকানার সুসময়ে ভিড় জমিয়েছেন, দুঃসময়ে দূরে সরে গেছেন। তাদের সম্পর্কে কবির ভাষায় বলতে চাই : ‘যখন তোমার কেউ ছিল না তখন ছিলাম আমি, এখন তোমার সব হয়েছে পর হয়েছি আমি।’ কিছুটা আবেগ থেকে এ কথা বললেও এটাই বাস্তবতা যে, যুগে যুগে কালে কালে বসন্তের কোকিলেরা ছিল, আছে, থাকবে চিরকাল। তাই যারা দুঃসময়ে ঠিকানার পাশে থেকে মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে আমাদের চলার পথের বাধা দূর করতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এবং এখনো রাখছেন, সেই শুভাকাক্সক্ষীদের প্রতি রইল আমার কৃতজ্ঞতা। সবশেষে ঠিকানার অগণিত পাঠক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বিজ্ঞাপনদাতাসহ জানা-অজানা সকল শুভার্থীকে জানাচ্ছি জন্মদিনের লাল গোলাপ শুভেচ্ছা।

এম এম শাহীন
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি, ঠিকানা ও সাবেক এমপি।

 

Facebook Comments Box

Comments

comments

Posted ৯:৪৮ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

America News Agency (ANA) |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Dhaka University Centennial & New Beginnings
(13555 বার পঠিত)
স্বামী তুমি কার?
(12861 বার পঠিত)
দল বেঁধে সৈকতে
(1424 বার পঠিত)
[abm_bangladesh_map]
Editor-in-chief :
Sayeed-Ur-Rabb
Corporate Headquarter :

44-70 21st.# 3O1, LIC. New York-11101. USA,

06463215067

americanewsagency@gmail.com

Copyright © 2019-2025Inc. America News Agency (ANA), All rights reserved.ESTD-1997