| বুধবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | প্রিন্ট | 502 বার পঠিত
প্রবাসী গল্পকার ও ঔপন্যাসিক দিলরুবা আহমেদের প্রচুর লেখা ইদানীং প্রায়শই আমরা জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে পাচ্ছি, বিশেষ করে ঈদ সংখ্যাগুলো। তাঁর লেখার প্রধানতম উপজীব্যই হলো প্রবাস জীবন, প্রবাসীর কথা আর তাই দিয়ে মালা গাঁথা। দেশ ছেড়ে পরদেশে একজন প্রবাসীর যে মানসিক অবস্থা, দ্বিধা দ্বন্দ¡, আবেগ, বিরাগ এবং বাস্তবতা থাকে তারই চিত্র দিলরুবা আহমেদ অপরূপ দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন।
এবারের বাংলা একাডেমির একুশের বইমেলায় (২০১৮) আসছে আমেরিকা পটভূমিতে লেখা ‘গ্রীন কার্ড’ উপন্যাসটি। ওই দেশের নাগরিকত্ব পেতে এবং চাইতে যে ধাপগুলো পেরুতে হয় তাই গল্পের চরিত্রগুলোর বয়ানের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। নিহা চরিত্রটি এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র। ইতোমধ্যেই নিহা চরিত্রটি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ২০১৭ এর বই মেলায় প্রকাশিত ‘ব্রাউন গার্লস’ উপন্যাসটিরও মূল চরিত্র সেই একই নিহা। নিহার আমেরিকায় যাওয়া, থাকা পড়াশোনা, চাকরি একাকিত্ব, প্রেম-সংগ্রাম পরিশ্রম সবই উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। সময়োপযোগী ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার জন্য ইতোমধ্যেই সুধীজনের সুনাম অর্জন করেছে ‘ব্রাউন গার্লস’ বইটি।
বহু লেখায় তিনি ইললিগালদের বেদনার কথাও লিখেছেন। যেমন একটি ‘মিসেসই ও সবুজ পাত্রী’, এই গল্পে ইললিগালদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভাবনা নিধি চরিত্রটি দিয়ে দেখিয়েছেন,
‘যেন এক ফোঁটা জলের তৃষ্ণা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাহারায়। তারা চারজনই এখন যেন ভাবছে কবে, কোথায়, কিভাবে ওই কাগজটা আসবে। বড় মেয়েটি কথা বলে কম অথচ সেই কিনা কয়দিন আগে বলেছিল বাপকে,
সবুজ কাগজটা হলুদ হয়ে গেছে বাপী। তুমি আর পাবে না। তোমাকে দেখ, পুলিশ এসে রেড কার্ড দেখাবে।
কী ভয়ঙ্কর কথা, অথচ মেয়েটা বলল কত সহজে। মেয়েকে ধমক দিয়ে নিধি জিজ্ঞেসও করেছিল,
এমন কথা বলছিস কেন বাপটাকে?
না বলে কি করব। আমাদের ক্লাসের সবাই তো ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য রেডি হচ্ছে। পেয়েও গেছে লারনার লাইসেন্স কয়েকজন। আমরা ইললিগাল বলে আমি তো এ্যাপলাই-ই করতে পারছি না।’
আরেকটি উল্লেখযোগ্য লেখা দৈনিক জনকণ্ঠে ঈদ সংখ্যায় (২০১৭) প্রকাশিত বড় গল্প ‘দ্রাবিড়াদির মহাশূন্যে।’ প্রবাসীর দত্তক নেয়া মেয়ে দেশে আসে পিতামাতার খোঁজে। খোঁজার সংগ্রামে সে বুঝতে পারে দেশের জটিল বাস্তবতা। ‘ডায়াস্পোরা’ নামের আরেকটি চমৎকার বড় গল্পে যেখানে দেখা যায় প্রবাসীরা যতটাই দূরে থাকুক হৃদয়ে ধারণ করেই বহন করে দেশ, দেশজ মনন-মানসিকতা।
দিলরুবা আহমেদের ‘প্রবাসী’ ছোট গল্পের গ্রন্থটিও মূলত মাইগ্রেট হয়ে যাওয়া বাস্তুছাড়া মানুষের নতুন করে শেকড় গজানোর অভিজ্ঞতার ওপর লেখা। প্রবাসের অনেক খুচরো খুচরো অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এগিয়েছে ঘটনাক্রম।
একেবারেই না বললেই নয় ‘টেক্সাস টক’ বইটির কথা। ভূমিকায় লেখিকা বলেছেন, ‘টেক্সাসে আমার পরবাসী জীবনটার সূচনা ২০০১-এ। রিমঝিম শব্দ তুলে স্বপ্নের কোন রূপকথায় যাত্রালোকের আনন্দে মহিত হয়েছিলাম কিনা সেই লগ্নে আজ আর তা মনে নেই। তবে দশটি বছর পেরিয়ে অনেক পরিণত এখন, প্রতি পলে, প্রতি পদে চতুর্দিকের বহুমুখী অচেনার সঙ্গে যোগাযোগ, ঠোকাঠুকি আর পরিচিত হয়ে ওঠার এই অভিযাত্রা, যা অবশ্যই এক ধরনের যুদ্ধ বই কি।’
সেই জানাকেই তিনি জানিয়েছেন আমাদের, ওনার ভাষায় ‘আমার চারদিকের সবকিছুকে ঘিরে কিছু সত্যের সঙ্গে কিছু কল্পনা বা কিছু শোনার সঙ্গে কিছু না দেখার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে’ উনি উপহার দিয়েছেন ‘টেক্সাস টক’। অত্যন্ত আলোচিত ও সব শ্রেণীর পাঠকের নজর কাড়া এই বইতে ২৫টি ছোট গল্প রয়েছে। ‘সোমালিয়ান সারা’ থেকে শুরু করে ‘ভারতী’ ও ‘কিটি পটি’ হয়ে ‘আমেরিকান বড়ি’কে খুঁজেছেন লেখিকা। প্রবাসের ঈদ রোজা শব-ই-বরাত আর হ্যালোইনও বাদ পড়েনি। চমৎকার একটি ধারণা পাওয়া যায় বিদেশে সন্তানের কাছে যে সব বাবা-মা থাকতে যান তাদের সম্পর্কেও। তাঁদের একাকিত্ব অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে এই বইয়ের ‘প্রবাসী পিতা-মাতা’ গল্পে। লেখিকার কলমে দু’জন প্রবাসী মা এসেছেন এভাবে,
‘তারা ছোটাছুটি করছেন ইতস্ততভাবে জোনাক ধরার ছলে এবং এই প্রথমবারের মতো আমার স্বামীর সঙ্গে কথা বলে উঠলেন, মানব পুত্র, কি অসাধারণ জায়গায় নিয়া আসছো গো, এ তো সেই গ্রামের ধানক্ষেতের জোনাকি।
শৈশবে যেন ফিরে গেল তারা, কৈশরে। গ্রামে, আঁধারে। ফেলে আসা কোথাও।
আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, বলতে গিয়েও বললাম না কোথায় এনেছি তাদের, কি দেখছে তারা। ফিরিয়ে দিলাম না ৭০, আমেরিকা আর একাকিত্ব। তারা ছুটছেন জোনাকিদের সঙ্গে সেই কৈশরের মতন। শুনছি তাদের খিল খিল হাসি। কানে বাজছে যেন সা-রে-সা। রুম-ঝুম-রুম। কতকাল পরে যেন হঠাৎ কোথাও সুর জেগেছে।’
খাদ্যের হারাম হালাল নিয়ে যে প্রবাসীরা দ্বিধাগ্রস্ত তাই এসেছে ‘হারাম হালাল’ নামের গল্পটিতে। তুলনামূলক একটি চিত্র ফুটেছে দেশী ও বিদেশী ভিক্ষুকের মধ্যে ‘দেশী-বিদেশী ভিক্ষুক’ গল্পে।
লাভ ও খড়াব গল্পে লেখিকা চমৎকার বলেছেন, ‘সমস্যাটা হচ্ছে লাভ আর খড়াব এর। দেশকে ভালবাসলেও যাচ্ছে না বা যেতে পারছে না কারণ লাভটা বেশি এ দেশে থাকায়।’
বিদেশে অনেকেই চলে যায় রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে। তাও উঠে এসেছে ‘আজি চোখ বুজে’ গল্পে, যেখানে অতীত তাড়া করে বেড়ায় মূল চরিত্রটিকে, ভাবে সেÑ ‘লেবাননের এতশত অনাথ শিশু কিংবা ইরাকের আশ্রয়হারা বাচ্চাগুলো কি প্রচ আক্রোশে বড় হবে না ইহুদী বা খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে! কিংবা যেসব আমেরিকান সৈনিক অন্য দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে তাদের বাচ্চারাও কি ভাববে না ওই দেশগুলো তাদের শত্রু? পালিত হবে কি লালিত এক ঘৃণার ইটারনিটি!’
প্রবাসে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের কাহিনীও বাদ পড়েনি লেখিকার শাণিত চোখে। ‘১৪১৪’ গল্পের শেষে বলেছেন, … ‘বিষণœ হয়ে হঠাৎই মনে হলো এ প্রজন্মের বাচ্চাগুলো কি কখনও পড়বে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম বা শরৎচন্দ্র। তারা তো এখনই বাংলা গান গাইছে ইংরেজীতে লিখে। এখানে শত বছর পর কি আমার মেয়ের পরের কোন এক প্রজন্ম গাইবেÑ এসো হে বৈশাখ, পরনে থাকবে যার ঢাকাই শাড়ি? কে জানে কি হবে তখন, অনেক শত বছর পরে!!’
৯১১ এই নম্বরটি আমেরিকান জীবনের সঙ্গে ওতপ্র্রোতভাবে জড়িত। নাকে পয়সা ঢুকিয়ে ৯১১ কল করেছে ‘নাইন ওয়ান ওয়ান’ গল্পে এক বালক। অন্য গল্পে আত্মহত্যা করতে চেয়েছে বলে ৯১১ এ জানান দেয়ায় এক বাঙালী যুবককে পুলিশে ধরে নিয়ে যায়।
‘টেক্সাস টক’ এক কথায় একজন প্রবাসীর সবদিক তুলে এনেছে।
চমৎকার গল্পের বাঁধুনী, সাবলীল ভাষা, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার অপরূপ ক্ষমতা, দিলরুবা আহমেদকে এনে দিয়েছে আজকের এই জনপ্রিয়তা।
Posted ২:৫১ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
America News Agency (ANA) | Payel