শনিবার ২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

>>

সবাইকে নিয়ে টেলিভিশন

  |   সোমবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭   |   প্রিন্ট   |   642 বার পঠিত

সবাইকে নিয়ে টেলিভিশন

আজ ২৫ ডিসেম্বর। ১৯৬৪ সালের এই দিনে ঢাকায় চালু হয়েছিল প্রথম টেলিভিশন কেন্দ্র। এই স্মরণীয় দিন উপলক্ষে লিখেছেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর

দেশের বাইরে প্রতি বছর শারজাহ স্টেডিয়ামে চ্যানেল আই পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড প্রদানের অনুষ্ঠান হয়। অ্যাওয়ার্ড প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সেরা তারকাদের পারফরম্যান্সও থাকে অনুষ্ঠানে। দর্শকরা এ অনুষ্ঠানের কথা পত্রিকায় পড়েন, চ্যানেল আইতে দেখেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের পেছনেও কিছু গল্প রয়েছে।

উদ্যোক্তারা শারজাহতে অনুষ্ঠান করার সময় খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বড় শো হয়েছিল অমিতাভ বচ্চন, এ আর রহমান আর শাহরুখ খানের। সেই শোগুলোতে দর্শক সংখ্যা ছিল ১২ থেকে ১৫ হাজার। দুবাইতে মাইকেল জ্যাকসন থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত শিল্পীরা অনুষ্ঠান করেছেন। কিন্তু সেসব অনুষ্ঠানের ভেন্যু ছিল বড় বড় হোটেল। আর শারজাহ স্টেডিয়ামে সবচেয়ে বড় ক্রিকেট আসর জমে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে। সে কথা সবার জানা। এই পাকিস্তান-ভারত খেলার সময় গ্যালারি ভরা দর্শক থাকলেও তার সংখ্যা ১৭ হাজারের অধিক নয়। সুতরাং চ্যানেল আই পারফরম্যান্সের উদ্যোক্তারাও ধরে নিয়েছিলেন, দর্শক সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়াবে না। সে অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা ঘটল অন্য রকম। অনুষ্ঠানের দিন দুপুর থেকে শারজাহ স্টেডিয়ামের আশপাশে শুধু বাংলাদেশের মানুষের ভিড়। বিকেলবেলা এই জনসমুদ্রের সংখ্যা ঠেকল ৫০ হাজারে। মাঠে কীভাবে ঢুকবে তারা? মাঠে সবার বসার ব্যবস্থা মাত্র ১৭ হাজার দর্শকের। হোটেল থেকে শিল্পীরা মাঠে ঢুকতে পারছেন না। গেটে দর্শকদের বিপুল ভিড়। মাঠের ভেতরে চেয়ার; চেয়ারের বাইরেও লোকজন ঘাসের ওপর আসন গেড়ে বসেছে। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা সাড়ে ৭টায়। যদিও শিল্পীরা রাস্তায় আটকে আছেন, ফলে অনুষ্ঠান হতে একটু দেরি হচ্ছে। ১৭ হাজার দর্শকের জায়গায় মাঠে তখন তিন গুণ দর্শক। সবাই চিন্তিত। কারও কারও পরামর্শ ছিল বিখ্যাত কোনো সঙ্গীতশিল্পী বা অভিনেতাকে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করার। সেসব ধারণা বাদ দিয়ে আফজাল হোসেন এলেন। পরিস্থিতি বুঝে তিনি শুরু করলেন- প্রিয় স্বজনেরা…

সেই প্রথম শব্দ। তার পর চার ঘণ্টার কোনো সহযোগী উপস্থাপক ছাড়া আফজাল হোসেন উপস্থাপনা করেছেন। দর্শক দেখেছে। স্টার, সুপারস্টারদের পারফরম্যান্সের মাঝখানে উপস্থাপনাও যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে- সেটা নতুন করে আবার প্রমাণ করলেন আফজাল হোসেন। উপস্থাপক একটি অনুষ্ঠানের যে সূত্রধর; দর্শকদের সঙ্গে মূল যোগসূত্র যে উপস্থাপক- আফজাল হোসেন প্রমাণ করলেন তা নতুন করে। যদিও বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপস্থাপকরা এ রকম দায়িত্ব বহুবার নিয়েছেন। বায়তুল মোকাররমেও তারাবির নামাজে এক হাফেজ ভুল পড়িয়েছিলেন। মুসল্লিদের মধ্যে মহা হৈচৈ। তার মধ্যে মাইক্রোফোন হাতে এক প্রধান মাওলানা নাম নূরুদ্দীন- উপস্থাপন করলেন এমন কিছু কথা, যা শুনে মুসল্লিরা মুহূর্তে শান্ত হয়ে গেলেন। আফজাল হোসেন বহু বছর আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান করেছিলেন ‘আপন প্রিয়’। তিনি যে সময় অনুষ্ঠান করেছিলেন, তখন বাইরের কোনো টেলিভিশনের অনুষ্ঠানই ঢাকায় দেখা যেত না। অথচ অনুষ্ঠানের সঙ্গে যারা জড়িত তারা যদি ভাবেন তাহলে বুঝবেন- ওই অনুষ্ঠানে এমন অনেক জিনিস দেখানো হয়েছে, যেটি এখন বড় হয়ে বহু টেলিভিশনের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে দেখানো হয়।

ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান করার মতো অডিটোরিয়ামের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের অডিটোরিয়াম বাইরের কোনো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয় না। সেখানে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান নির্মাতারা কেবল তাদের বুদ্ধি, মেধা, মনন দিয়ে নানা স্পটে শুটিং করে অনুষ্ঠান তৈরি করছেন। রামপুরার বাইরে পুরো ঢাকায় অনেক স্পটেই যে অনুষ্ঠান করা হয়- তার একটা বড় প্রমাণ রেখেছেন ‘ইত্যাদি’র উপস্থাপক হানিফ সংকেত। কিন্তু এই প্রমাণ রাখার জন্য হানিফ সংকেতকে পার হতে হয়েছে বহু পথ। অর্জন করতে হয়েছে বহু অভিজ্ঞতা। রামপুরার তিন নম্বর স্টুডিও, অডিটোরিয়াম থেকে জাদুঘরের অডিটোরিয়াম, তার পর এত কিছু। এই যে উপস্থাপকদের কথা এত বললাম, এর বাইরেও বিটিভির অনেক বড় বড় উপস্থাপক রয়েছেন। জীবনে তারা বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেক বড় বড় কাজ করেছেন। আজকে একটি টেলিভিশন চ্যানেল নয়, অনেক চ্যানেল। কিন্তু সে রকম বড় উপস্থাপক, বড় অনুষ্ঠান কোথায়! অথচ আজকে আমাদের চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা খোলা। মুক্ত আকাশ নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে।

এখনকার দিনে শুটিংয়ে হেলিকপ্টার ব্যবহার খুব একটা বড় কথা নয়। কিন্তু সেই সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের পক্ষে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা ও তাই নিয়ে শুটিং, শুধু দর্শকদের নতুন কিছু উপহার দেওয়ার জন্যই করা হয়েছিল। সংশপ্তক নাটকে দুটি জনপ্রিয় চরিত্র ছিল- কানকাটা রমজান ও কিশোর চরিত্র মালু। স্বাধীনতার আগে কানকাটা চরিত্রে অভিনয় করেন এটিএম শামসুজ্জামান, স্বাধীনতার পরে হুমায়ুন ফরীদি। মালুর চরিত্রে আগে অভিনয় করেছিলেন মাস্টার রিপন (পুরো নাম এনামুল হক, বর্তমানে রফতানিমুখী একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও মাস্কট গ্রুপের অন্যতম পরিচালক)। আর স্বাধীনতার পর মালুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মুজিবুর রহমান দিলু।

টিভি নাটকের ইতিহাস লিখতে গেলে অবশ্যই বলতে হবে ‘রক্তকরবী’র কথা। এখনকার শিল্পীদের ‘রিহার্সেল’ করার কথা বললে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উত্তর আসে- রিহার্সেল আর কী! ক্যামেরা অন করলে হয়ে যাবে। কিন্তু সে সময় রিহার্সেল ছিল একটি বাধ্যতামূলক ব্যাপার। এখনও টেলিভিশনে নাটক বা সঙ্গীতশিল্পীদের যে সম্মানী প্রদান করা হয়, সেখানে তিন থেকে পাঁচ দিনের রিহার্সেল ফি ধরা থাকে। যদি কোনো শিল্পী রিহার্সেলে না আসতেন তাহলে সে দিনের ফি পারিশ্রমিক থেকে কেটে দিতেন প্রযোজক।

‘রক্তকরবী’ নাটকের মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন মূল প্রযোজক। তার সঙ্গে সহযোগী প্রযোজক ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। রক্তকরবীর নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন দিলশান খানম, দিলারা হাশেমের যিনি ছোট বোন। দিলশাদ খানমরা তিন বোন- সুরাইয়া খানম, দিলারা হাশেম ও দিলশান খানম। এ তিনজনই টেলিভিশনের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। রিনি রেজা, শম্পা রেজা, নিপা রেজা- এ তিন বোনই টেলিভিশনে বহু অনুষ্ঠান করতে চলে এসেছে। শুধু অনুষ্ঠান নয়; মা-মেয়ে খবর পড়ছে কিংবা নৃত্য পরিবেশন করছে একই সঙ্গে, যেমন সংবাদ পড়ছেন রূমানা চৌধুরী, ফারিহা চৌধুরী কিংবা নৃত্য পরিবেশন করছেন সুলতানা হায়দার ও অরুণা হায়দার। শুধু পর্দায় উপস্থিতি রয়েছে এমনও নয়, টেলিভিশনের কলাকুশলীদের ক্ষেত্রে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে; যা থেকে বলা যায় পারিবারিকভাবে পেশা ও নেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে। টেলিভিশনের প্রখ্যাত সেট ডিজাইনার রেজাউল করিমের বড় ছেলে পান্থ রেজা এখন চিত্রগ্রাহক। পারিবারিকভাবে টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত এমন নাম অনেক দেওয়া যাবে। আবুল হায়াতের পরিবার বা রামেন্দু মজুমদারের পরিবার কীভাবে উপস্থিত হচ্ছেন- এটা তো টিভির নিয়মিত দর্শকদের জানা। শুধু অনুষ্ঠান কেন, বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে জাহিদ-মৌ কিংবা মৌসুমী-ওমর সানি তাদের সন্তানকে নিয়েও নিয়মিত পর্দায় উপস্থিত হচ্ছেন। আমাদের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের জগতেও পার্থক্যটা উল্লেখ করার মতো। টেলিভিশনে পারিবারিক বন্ধন বা পরিবারিকভাবে সবকিছু উপভোগ করা হয় বলে হয়তো টেলিভিশন এত সহজে দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

‘রক্তকরবী’ নাটকের প্রযোজক যদিও মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন, কিন্তু তখন তিনি ঢাকা টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার। জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে তার অনেক দায়িত্ব। তারপরও নাটক প্রযোজনার ক্ষেত্রে তার আগ্রহের কমতি ছিল না। টেলিভিশনের রেকর্ডিং হতো সারা রাত। একদিন শিল্পীরা সন্ধ্যা থেকে ‘রক্তকরবী’ নাটকের জন্য তৈরি। রেকর্ডিং শুরু হবে কিছুক্ষণ পর। রাজা আর কিশোর দু’জন ক্যামেরার সামনে যাবে। রাজা চরিত্রে অভিনয় করছেন জামালউদ্দীন হোসেন আর কিশোর চরিত্রে সাইদুল আনাম টুটুল। কিন্তু রাজার মুকুট মুস্তাফা মনোয়ারের পছন্দ হলো না। তিনি বললেন, আরও একটু কাজ করতে হবে। বসে গেলেন মেকআপ রুমে। টেবিলে বসে মুস্তাফা মনোয়ার কাজ করে যাচ্ছেন। শিল্পীরা সবাই অপেক্ষায়। শুটিং শুরু হলো ভোরবেলা ফজরের নামাজের পর। সারারাত সবাই অপেক্ষা করেছেন। খাবারের জন্য কেউ হৈচৈ করেননি। কখন শুটিং শুরু হবে, সেটা নিয়ে কেউ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলেননি। কেউ কেউ হয়তো মেকআপ রুমে উঁকি মেরে দেখে গেছেন- মুস্তাফা মনোয়ার কী নিবিষ্ট মনে কাজ করে যাচ্ছেন!

রাতের শুটিং ভোরবেলা শুরু হলো। কেউ বিরক্ত নন। সবার মনে তৃপ্তি- ‘রাজার মুকুট’ দেখার মতো হয়েছে। দর্শকরা দেখে বলবে, বাহ্‌ বইয়ের পাতার রাজাই তো চলে এসেছে টেলিভিশনের পর্দায়- শুধু এই মন্তব্যটুকুর জন্যই সবার এই কষ্ট। এত চেষ্টা।

Facebook Comments Box

Comments

comments

Posted ৩:০৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭

America News Agency (ANA) |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Dhaka University Centennial & New Beginnings
(13555 বার পঠিত)
স্বামী তুমি কার?
(12861 বার পঠিত)
দল বেঁধে সৈকতে
(1424 বার পঠিত)
[abm_bangladesh_map]
Editor-in-chief :
Sayeed-Ur-Rabb
Corporate Headquarter :

44-70 21st.# 3O1, LIC. New York-11101. USA,

06463215067

americanewsagency@gmail.com

Copyright © 2019-2025Inc. America News Agency (ANA), All rights reserved.ESTD-1997