শনিবার ২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

>>

আদোনিস :প্রেম ও মিস্টিক-মগ্নতার কবি

অনলাইন ডেস্ক :   |   রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭   |   প্রিন্ট   |   687 বার পঠিত

আদোনিস :প্রেম ও মিস্টিক-মগ্নতার কবি

আদোনিস [জন্ম :১ জানুয়ারি, ১৯৩০]

একটা গল্প দিয়ে এই লেখাটা শুরু করি। সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশভ্রমণে বেরিয়েছেন। লক্ষ্য- জনগণের সঙ্গে একাত্ম হওয়া। তাদের সুখ-দুঃখের কথা শোনা। প্রেসিডেন্টের দেশভ্রমণের এ খবর শুনে এক বালকের ইচ্ছে হলো তাদের এলাকায় তিনি যখন আসবেন তখন তাকে একটি কবিতা পড়ে শোনাবে। বাবাকে এই ইচ্ছেটা বলার সঙ্গে সঙ্গে বাবা বললেন, প্রেসিডেন্টকে কবিতা পড়ে শোনানোর সুযোগ তোকে কে দেবে, বল তো!

বালকটি বাবার এ কথা শোনার পরও ঠিকই একটি কবিতা লিখে ফেলল। নির্দিষ্ট দিনে প্রেসিডেন্ট এলেন। বালকটি তার এলাকার মেয়রের সঙ্গে দেখা করে কবিতাটা দেখিয়ে বলল, এটি সে প্রেসিডেন্টকে পড়ে শোনাবে। মেয়রের কী যেন মনে হলো, তিনি বক্তাদের তালিকার শেষে বালকটির নাম অন্তর্ভুক্ত করলেন। যথাসময়ে শুরু হলো সেই সভা। সেখানে প্রেসিডেন্ট সবার কথা শুনতে থাকলেন। সভাটি যখন প্রায় শেষ হয়ে আসছে, মেয়র উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মাননীয় প্রেসিডেন্ট, আমাদের আরেকজন বক্তা বাকি আছে। এক বালক আপনার সম্মানে স্বরচিত কবিতা পড়ে শোনাবে।’ বালকটি মঞ্চে উঠে ধীর গলায় স্মৃতি থেকে একটা কবিতা পড়ে শোনাল। এই যে বালকটির কথা বলছি, তিনিই হচ্ছেন কবি আদোনিস। তার বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। ১৯৪৪ সালে সিরিয়া স্বাধীন হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট শুকরি আল-কুয়াতলি যখন জাবলে শহরে আসেন তখন আদোনিস তাকে একটি কবিতা পড়ে শুনিয়েছিলেন। কবিতাটিতে ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের সৌহার্দ্য স্থাপন আর সুশাসনের কথা। আদোনিস যখন কবিতাটা পড়া শেষ করলেন, অভিভূত প্রেসিডেন্ট নিজের আসন থেকে উঠে গিয়ে তাকে চুমু খেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলো, তুমি কী চাও?’ একটুও সময় না নিয়ে আদোনিস বললেন, ‘শিক্ষা। আমি চাই পড়ালেখা করতে।’

এক সপ্তাহের মধ্যে আদোনিসের কাস্‌সাবিনের বাড়িতে প্রেসিডেন্টের আদেশ এসে পৌঁছুল। তারতুস; ভূমধ্য সাগরপারের ছোট্ট একটা শহর, উত্তরের বড় শহর লাতাকিয়া থেকে যার দূরত্ব প্রায় ৫০ মাইল, সেখানকার একটি স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেন আদোনিস। এর পর তার সুযোগ হলো লাতাকিয়াতে পড়াশোনা করার। ১২ বছরের পড়াশোনা মাত্র ৫ বছরে শেষ করলেন তিনি।

লাতাকিয়াতে থাকতেই আদোনিস রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তি, যারা তখনও সিরিয়াতে রয়ে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে মিছিল, আন্দোলনেরও সংগঠক ছিলেন। ১৯৫০ সালে ভর্তি হলেন দামাস্কাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। আদোনিস তখনই তার প্রথম দিককার কবিতাগুলো বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকেন। তার লক্ষ্য ছিল সমকালে লেখা আরবি কবিতাকে নবায়িত করা। ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না। কারণ আরবি কবিতার প্রধান প্রবণতাই হচ্ছে ঐতিহ্যকে প্রবলভাবে আঁকড়ে থাকা। সনাতন কাব্যশৈলী বা কাব্যভাষাকে কেউ বদলাতে চান না। কিন্তু আদোনিস কাজটা করলেন। উঁচু স্বরের জাতীয়তাবাদী কবিতা লিখলেন। তীব্রভাবে সিরিয়ার সমাজ কাঠামোর সমালোচনা করলেন।

দামাস্কাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আদোনিস গ্র্যাজুয়েট হলেন; মাস্টার্স করলেন সাহিত্য নিয়ে। তার গবেষণার বিষয় ছিল আরবি মিস্টিক কবিতা। ১৯৫৬ সালে বিয়ে করলেন খালিদা সালেহ নামে সিরীয় তরুণীকে। খালিদা নিজেও রাজনীতি করতেন আর সাহিত্যবোধও ছিল। এর পর আদোনিস সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি সাহিত্যে পিএইচডি করলেন। হয়ে উঠলেন একজন সাহিত্য সমালোচক। আরববিশ্বে এটি ছিল বেশ গৌরবের ব্যাপার। বিয়ের পরপর আদোনিস সিরিয়া ত্যাগ করে লেবাননে এলেন। কবিতা ও সমালোচনা; দুই ক্ষেত্রেই সচল হয়ে উঠল তার কলম। এখানে বলে রাখি, পুরাণে আদোনিস নামে এক কবি আছেন। সেই কবি এই লেবাননে বাস করতেন। তার প্রেম ও মৃত্যু ঘটেছিল লেবাননেই। মৃত্যু আর পুনরুত্থানের পৌরাণিক কবির নাম এ কারণেই একালের কবি আদোনিস, যার আসল নাম আলী আহমদ সাইয়ীদ- গ্রহণ করেছিলেন।

ইউসেফ এল-খালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তরুণ কবি আদোনিস ‘শীর’, কবিতার পত্রিকার সূচনা করলেন। পত্রিকাটি অচিরেই তরুণ কবি, যারা নতুন ধরনের কবিতা লিখতে চান, তাদের মুখপাত্র হয়ে উঠল। আজকের আরববিশ্বের প্রথিতযশা প্রায় সব কবির প্রথম কবিতা এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৬০ সালে তিনি চলে এলেন সোরবনে। ‘শীর’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেই একটি পত্রিকা প্রকাশ করলেন। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সাংবাদিকতার পেশা বেছে নিলেন। বৈরুতের একটি পত্রিকার সম্পাদক হলেন তিনি। কিন্তু কখনও কবিতা লেখা ছাড়েননি। এই সময়েই তিনি প্রকাশ করলেন আরবি কবিতার একটি সংকলন- ‘অ্যানথলজি অব অ্যারাবিক পোয়েট্রি’।

১৯৬৮ সাল নাগাদ তার উচ্চাশা বেড়ে গেলে নিজেই ‘মাওয়াকেফ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করলেন। এই পত্রিকাতেই তার কবিতা ও কবিতা বিষয়ক অনেক গদ্য প্রকাশিত হয়। লিখলেন, আরবি কবিতায় তিনি ও তার কবি সতীর্থরা নতুন স্বর ও বিষয়-ব্যঞ্জনা আনতে চান। প্রকৃতপক্ষে পত্রিকাটি তখন কবিদের মুক্তভাবে নিজেদের কথা বলা ও প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

আসলে কবিতাতেই আদোনিস তার মানব-ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ১৯৫৭ সালে তিনি প্রকাশ করলেন তার প্রথম কবিতার বই ‘প্রথম কবিতাগুচ্ছ’। বিষয়-আশয় ছিল দারিদ্র্য, শৈশবের স্মৃতি আর মৃত্যু। এ সবই আসলে আদোনিসের কবিতার মূল প্রবণতা। শৈশব আর দারিদ্র্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে বলে তার মনে হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই কিছু মানুষ আছেন যারা পৃথিবীকে বদলে দিতে পারেন, বদলে দেন। মৃত্যুও তার মনে হয় সহজ ও প্রাকৃতিক। মৃত্যুর কাছে ফিরে যাওয়া মানে প্রেমের কাছে ফিরে যাওয়া, প্রেমকে উপলব্ধি করা। এই যে কবিতা তিনি লিখলেন, তা ছিল নিঃসন্দেহে মিস্টিক কবিতা। এই মিস্টিক টোনে লেখা কবিতার অনুষঙ্গেই তার হাতে জন্ম নেয় ‘মাইহার’ কবিতা। এ ধরনের একটি কবিতার দৃষ্টান্ত- ‘আগুনবৃক্ষ’ কবিতাটির নাম। পঙ্‌ক্তিগুলো এ রকম :নদীর পাড়ে দাঁড়ানো গাছ/ ক্রন্দনে ক্রন্দনে পাতা ঝরিয়ে দিচ্ছে।/ সরে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে/ ফোঁটায় ফোঁটায়/ নদীকে সে পড়তে পারে/ আগুনের পূর্বাভাস দিতে পারে।/ আমিই সেই সর্বশেষ পাতা যাকে কেউ কখনও/ দেখেনি।/ আমাদের জনমানুষ/ আগুনেই তাদের মৃত্যু হয়/ মরে- কিন্তু কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না।

এর পর ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘বাতাসে উড্ডীন পত্রাবলি’ শীর্ষক কবিতার বই। এই বইতেও মৃত্যু প্রবলভাবে উপস্থিত। খ্রিস্ট ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে মৃত্যুকে তিনি এ বইতে বিষয় হিসেবে গ্রহণ করলেন। লিখলেন, মৃত্যু হচ্ছে নতুন জীবনের শুরু। শুরু এই কারণে যে, এই মৃত্যুর মধ্য দিয়েই মানুষ ভূপৃথিবীর সঙ্গে একাত্ম হয়; আর এটাই হচ্ছে আসলে জীবনের শুরু।

আদোনিসের ‘মাইহার’ কবিতারও অনন্যতা আছে। মাইহারেই কবির ভাবনা, আশা, স্বপ্নের রূপায়ণ লক্ষ্য করি আমরা। এখানে আদিবাসীদের একটি তরবারির কথা আছে। তরবারিটি প্রতীকী, যা সমাজকে বদলে দিতে চায়, ধর্মকে আকার দিতে চায়, নিয়তির দিকে যেন নিস্পৃহভাবে এগিয়ে যায়। ইমামকে অস্বীকার করা সন্ত যেন আদোনিস- তার কবিতা সম্বন্ধে এমন মন্তব্যও করেছেন কোনো কোনো সমালোচক। মানুষ তার কবিতায় একই সঙ্গে ‘ঈশ্বর ও দাস’ দুই-ই। কবি হচ্ছে এরই মধ্যে রাজা, যিনি আগুন আর শীতলতার মধ্যে বসবাস করেন। বস্তুর অন্ধকারময় অন্তর্গত গোপনীয়তাই আসল কথা। আপেল বাগানে বা ইভের হাতে এভাবেই সংগোপন সৌন্দর্য বিভা পেয়েছে। আদোনিস এরই টানে পৃথিবী ছেড়ে মহাশূন্যে প্রবেশ করেছেন। প্রবেশ করেছেন গ্রহাণুপুঞ্জের ভেতরে। আদোনিসের পরবর্তী কবিতার বই ‘মঞ্চ এবং মুকুর’। প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। এ বইটি অনেকটা আয়নাবাজির মতো। একই সঙ্গে এই আয়নায় অতীত আর বর্তমান প্রতিফলিত হচ্ছে। ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে মানবিকতার সংঘাত বিষয় হয়ে উঠেছে এই বইয়ের। সপ্তম শতকের ইসলামী দার্শনিক গিফারিকে পুনর্জন্ম দিয়ে সমকালীন সোস্যালিস্ট বিপ্লবকে তুলে ধরলেন তিনি। তীব্রভাবে সমালোচনা করলেন আরববিশ্বের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে। বললেন, এসব আজ বোঝা হয়ে আছে, আরববিশ্বের মানুষকে উন্মার্গগামিতার দিকে প্ররোচিত করছে। ‘অন্ধকারের জাহাজে’ এরই বিরুদ্ধে প্রজ্বলিত করতে হবে ‘আলোর বাতিঘর’।

সমকালীন আরবি কবিতায় আদোনিসের প্রধান অবদান হচ্ছে- স্বাধীনতা, স্বাধীনতা- শব্দের স্বাধীনতা। অনন্য কবিতাদৃষ্টির সৌজন্যে এই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলেছেন তিনি। একদিকে মিস্টিসিজম, আরেকদিকে অস্তিত্ববাদ, সমাজতন্ত্র আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, কবিতা ও বাস্তবতা পরস্পর সহাবস্থান করে।

পরিশেষে বলা যায়, আরবি ভাষা সম্পর্কে তার সুগভীর জ্ঞান ও উপলব্ধি, শব্দের জন্য তার সংবেদনা নতুন ধরনের শৈলী আর কবিতা রচনায় তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিও তার বিরূপতা সর্বজনবিদিত। তার এপিকতুল্য কবিতা ‘নিউইয়র্কের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ শীর্ষক কবিতাটি পড়লেই তা বোঝা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের জীবনের অসঙ্গতি, যুদ্ধ, অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার তিনি। তার কবিতার মার্কসীয় অনুষঙ্গও আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না। সামগ্রিকভাবে কি পূর্ব, কি পশ্চিম- মানবিক বিপন্নতাই তার কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে :’কি পুব কি পশ্চিম/ তুমি মানুষের সঙ্গেই থাকবে/ কিন্তু এই মানুষের একমাত্র ইতিহাস হচ্ছে অঘ্নি।’

কাব্যশৈলীর দিক থেকে তার কবিতা পারস্পরিক বৈপরীত্য বা বাইনারি সংঘাতে দ্বন্দ্বরক্তিম, টানাপড়েনে উজ্জ্বল। কন্ট্রাস্ট আর কাউন্টার পয়েন্ট, বিস্ময় আর বিভ্রম- এসবেরই অবস্থান। আরবি কবিতায় আদোনিসের প্রভাব তাই অগ্রাহ্য করা যাবে না। ইরাকের কবি জলিল হায়দার ও মোয়ায়েদ এল-রাওয়াদি; মিসরের ফ্রাঁসোয়া ব্যাসিলি, সিরিয়ার মাহমুদ আদোয়ান তারই উত্তরসূরি বলা যায়।

বাংলা কবিতার মতো আরবি কবিতাও পশ্চিমা প্রভাবে আচ্ছন্ন ছিল, অথবা তাতে দেখা গেছে লোকসংস্কৃতির প্রভাব। আদোনিস আরবি সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত থেকেও বাইরের পৃথিবীকে অগ্রাহ্য করেননি। পৃথিবীর হূৎস্পন্দন তার কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে। আদোনিসের অনন্যতা এইখানে। আসন্ন কোনো বছরে তিনি যদি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে যান, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

আদোনিসের মুকুটে কৃতিত্বের কয়েকটি পালক :

১৯৭১ :সিরিয়া-লেবাননের সর্বশ্রেষ্ঠ কবির পুরস্কার

১৯৮৩ :প্যারির স্তেফান মালার্মে একাডেমির সদস্যপদ অর্জন

১৯৮৬ :ব্রাসেলসের দ্বিবার্ষিক আন্তর্জাতিক কবিতা সম্মেলনে সর্বোচ্চ পুরস্কার

১৯৯৫ :প্রথম কবি হিসেবে আন্তর্জাতিক নাজিম হিকমত কবিতা পুরস্কার লাভ।

ঢাকায় সমকালের আরবি ভাষার এই মহান কবিকে স্বাগত।

অনুবাদে আদোনিসের প্রেমের কবিতা

আদোনিস সম্পর্কে আমার পঠন-পাঠনের যৎকিঞ্চিৎ নিবেদন করেছি। একবার এরই অংশ হিসেবে আমার হাতে আসে তার প্রেমের কবিতার একটি সংকলন। এর নাম ‘যদি সমুদ্র ঘুমাতে পারতো :প্রেমের কবিতা’। সংকলনটি হাতে পাওয়ার পর এর কবিতাগুলো বেশ কয়েক দিন মোহাচ্ছন্নের মতো পড়েছি। এত ভালো প্রেমের কবিতা এর আগে পড়েছি কি-না মনে করতে পারছি না, একমাত্র বৈষষ্ণব পদাবলী ছাড়া। আদোনিসের প্রতিটি কবিতা আমাকে বিদ্যুৎস্পর্শের মতো চমকে দিয়েছে। সেই তাড়নাতেই আমি ওই সংকলনের সব কবিতা অনুবাদ করে ফেলি।

প্রেমের কবিতার আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে, তা যে কবিই রচনা করুন না কেন। পৃথিবীর বোধ হয় সবচেয়ে মধুর বাক্য হচ্ছে এটি :’আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ কিন্তু প্রেমের কবিতা লেখা সহজ নয়। প্রেমের কবিতার নন্দনতত্ত্ব, নেরুদা একবার বলেছিলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতীকী। কবিকে বস্তুপৃথিবীর সঙ্গে অনুভূতিকে মিশিয়ে কবিতা রচনা করতে হয়। কিন্তু সরাসরি নয়, আশ্রয় নিতে হয় রূপক, প্রতীক, উপমা ও চমকপ্রদ বাকপ্রতিমার। পাঠকও ভাবনায় ডুবে যান কবি কী বলতে চাইছেন, কীভাবে বলছেন তা বোঝার জন্য।

আদোনিসের প্রথমদিকের প্রেমের কবিতা স্থান ও কালগত দিক থেকে অনেকটা সুনির্দিষ্ট। একজন কথক ঘুরে-ফিরে কথা বলছে। এখানে ‘প্রেম’ এই শব্দটিই ব্যবহূত হয়েছে সরাসরি। উত্তম পুরুষ সরে গিয়ে আবির্ভাব ঘটে প্রেমের দুই পাত্র-পাত্রী- আমি ও তুমির। এখানেই প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের আত্মপরিচয় নিয়ে উপস্থিত।

কবিতায় আদোনিস ব্যবহার করেন চমকপ্রদ বাকপ্রতিমা। অনুভূতি আরও ঘন আরও তীব্র হয়। কবিতার এই নান্দনিক ও সাংগঠনিক কাঠামোকে ঘিরেই রচিত হয়েছে আদোনিসের কবিতাগুলো। ‘এইভাবে শুরু’ শীর্ষক ১৩টি কবিতায় পূর্বে অনুসৃত রীতিকে ভেঙে ফেলে প্রেমের কবিতার সীমাকে তিনি আরও প্রসারিত করে দিয়েছেন। কয়েস (মজনু) ও লায়লা- সপ্তম শতাব্দীর ইতিহাস থেকে তুলে এনেছেন এই যুগলকে, যাদের প্রেম বিশ্বব্যাপী পরিচিত। সময়ের ক্রমকে ভেঙে তিনি রচনা করলেন অনুভূত আবেগের ওপর নির্ভরশীল কামনা-বাসনাময় কবিতা। শরীর প্রাধান্য পায় এসব কবিতায়। যৌনতার সংস্পর্শে কবিতাগুলো জ্বলে ওঠে নতুন বাক-ভঙ্গিমায়। দীর্ঘ কবিতায় ইঙ্গিতগর্ভ অনুষঙ্গ নিয়ে আবির্ভূত হয় কয়েস বা মজনু। এখানে প্রেমিকার শরীর হয়ে ওঠে আরও স্পর্শময়, যে শরীর হয়ে উঠেছে উর্বর শস্যক্ষেতের প্রতীক, যেখানে কাঁটা আর শস্যের সমাহার। নারীর এখন নানা রূপ :অঘ্নি, নদী, পুষ্প, নগর ইত্যাদি। আদোনিসের দীর্ঘ প্রেমের কবিতাগুলো সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বেশ গভীর আর বৈচিত্র্যময়। আত্মগত অনুভূতি আর শরীরী সংরাগে অপূর্ব, অনন্য।

এখানে তার কয়েকটি কবিতার অনুবাদ তুলে দিচ্ছি। বলা বাহুল্য, অনুবাদ আমারই।

প্রেম

এই বাড়ি আর ওই পথ আমাকে ভালোবাসে

মৃত আর জীবিতেরা

বাড়ির

লাল জগের পানি তার জগটাকে ভালোবাসে

প্রতিবেশীরাও ভালোবাসে আমাকে

মাঠ আর মাড়াইকলের মেঝে

অঘ্নি

পৃথিবীর সাথে

তালে তালে নাচানো সুখী হাত

অথবা অসুখী

যে-অশ্রু শস্যের ভেতরে লুপ্ত

আমার ভাই ঝরিয়ে দিয়েছে

রক্তকে করেছে অভিভূত সেই যে বনফুল

এখানে থেকেছি আমি যতক্ষণ ছিলেন প্রেমের ঈশ্বর

কী করবে প্রেম যদি মরে যাই আমি।

প্রেমের বাড়ি

(সংক্ষেপিত)

আমি তোমাকে ভালোবাসি

যেন সমস্ত হৃদয় আমার আয়না হয়ে গিয়েছিল

জীবন বুঝি আমার ভালোবাসার জন্যেই আবিস্কৃত হয়েছিল

আমি তোমাকে ভালোবাসি

ওহ্‌ কতদিন আমি তোমার ওষ্ঠ থেকে মুছে গেছি

হৃদয় আমার হয়ে গেছে পথ আর বাড়ি

যেন মেঘের ওপরে ঝুলন্ত মেঘমালা

কী করে যে আমি সুন্দরের সঙ্গে তোমাকে মেলাই আর কল্পনার জাল বুনি

কী করে কীভাবে

আমি তোমাকে ভালোবাসি

তোমার চোখ থেকে আলো সরে গেছে

বন্যার মতো দু’কূল উপচানো

তোমার চুল দিগ্‌ভ্রান্ত তুষারের মতো গ্রীবার ওপর ছড়িয়ে পড়েছে

জরি দিয়ে মোড়া, আঁটোসাঁটো বাঁধা অথবা শিথিল

মনে হয় সময় গলে গিয়ে আমার চোখের মণিতে থিরবিজুরি

নৈঃশব্দ্যের মতো

ঘনীভূত অথবা চঞ্চল।

যৌনতার শুরু :এক

ঘর ব্যালকনি অন্ধকার ক্ষতের কত যে চিহ্ন একটি শরীর ভেঙে পড়ে সুখে বিবসনা

ইতস্তত ঘুরে বেড়ায় অথবা হারায়

প্রশ্ন আর উত্তরের মাঝে আমাদের রক্ত ঘুরপাক খায়

বলা কথাগুলো কেমন বিহ্বল।

যৌনতার শুরু :দুই

ঘরগুলো হাত বাড়িয়ে বেঁকে আছে, আর কাম গড়ে তুলছে তার সৌধমিনার-

ভূপাতিত নিক্ষিপ্ত

একসাগর দুঃখের মাঝে

দুঃখ

কটিতটের ব্যবধানের ভেতর দিয়ে- যৌনতা খুলছে দরোজা-

আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম।

জন্ম হচ্ছিল আগুনের আর রাত্রি পাকাচ্ছিল তার কুণ্ডলী

জ্বালিয়ে দিচ্ছিল প্রদীপের আলো

একটা টিলা, ভরে ফেললাম গর্ত

আর দূরের কোনো শূন্যতার মাঝে ফিসফিসিয়ে

হাতগুলো বাড়িয়ে দিলাম।

তিক্ত ওই আলো ছিল নদীর মতো

তীর হারিয়েছে, আমরা ওর পানি

নিজের করে নিয়েছি,

নদীতীরের খেয়ালে

আমরাই বানিয়েছি আমাদের পোশাকের তীর

শব্দের শুরু

আমাদের যুগল শরীর বজ্র

তুমি বললে, আমি শুনলাম

আমি বললাম, তুমি শুনলে, শব্দেরা জড়াজড়ি করে।

আমাদের যুগল শরীর আশ্নেষে নিবিড়

তুমি পড়ে গেলে, আমিও পড়লাম

জাদুবিভ্রম আর আগুনের শিখা ঘিরে থাকলো আমাদের

তুমি পড়ে গেলে, আমিও পড়লাম।

তুমি আর আমার মাঝে

শব্দেরা জড়ো হয়

আর জ্বলে।

বাতাসের শুরু

“রাতের শরীর” বললো সে, বলেই চলে “বাড়ি

মুক্ত ক্ষত আর তাদের দিনের জন্য…”

সূর্যাস্ত শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও শুরু, ছায়ার মধ্যে প্রবেশ করলাম আমরা

আমাদের স্বপ্ন জড়িবুটি দিয়ে জড়ানো বুনন

সূর্যট তার বোতামগুলো খুলে দিল :’সমুদ্র দিয়ে মোড়ানো ফেনা

আসতে পারে।’ আমরা আমাদেরই

দূরত্বের পাঠ নিচ্ছিলাম।

উঠে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাতাস আমাদের চিহ্ন মুছে ফেলছে

আমরা ফিসফিস করে বললাম

আবার আমরা গোপনে মিলবো

আর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো।

মাসুদুজ্জামান
–সমকাল

Facebook Comments Box

Comments

comments

Posted ৪:২৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭

America News Agency (ANA) |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Dhaka University Centennial & New Beginnings
(13555 বার পঠিত)
স্বামী তুমি কার?
(12861 বার পঠিত)
দল বেঁধে সৈকতে
(1424 বার পঠিত)
[abm_bangladesh_map]
Editor-in-chief :
Sayeed-Ur-Rabb
Corporate Headquarter :

44-70 21st.# 3O1, LIC. New York-11101. USA,

06463215067

americanewsagency@gmail.com

Copyright © 2019-2025Inc. America News Agency (ANA), All rights reserved.ESTD-1997