অনলাইন ডেস্ক : | শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | প্রিন্ট | 722 বার পঠিত
শুক্রবার সকাল থেকে টানা ও দীর্ঘ ক্লাস নিচ্ছিলাম, বলতে গেলে সারাদিনের জন্য। অংশগ্রহণকারী তারা, যারা প্রকৃতি, পরিবেশ, পাখি, নিসর্গ নিয়ে লেখালেখি করবেন। কিন্তু ক্লাসের প্রয়োজনীয় অখণ্ড মনোযোগ বারবার কেড়ে নিচ্ছেন সদ্য প্রয়াত নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা। মনে পড়ছে, তাকে ঘিরে যেভাবে তরুণরা তরু ও পল্লবের প্রতি আগ্রহী হয়েছিল, সেই কথা। আমাদের সবার প্রিয় দ্বিজেন শর্মা বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষার লেখনী ও বাঙালির প্রকৃতি চিন্তা ও চর্চায় রেখে গেলেন তার প্রগাঢ় পদচিহ্ন।
দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় অনেক পরে। কিন্তু তাকে আমি জানতাম তার বইয়ের মাধ্যমে। প্রথম যে বইটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, তার নাম ‘শ্যামলী নিসর্গ’। বইটি বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছিল। পরে আরও সম্ভবত দুটি সংস্করণ প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু আমি পেয়েছিলাম একেবারে প্রথম সংস্করণ। তিনি বইটি লিখেছিলেন প্রথম প্রকাশে ১৬ বছর আগে। পাকিস্তান আমলে, পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত একজন শিক্ষক হিসেবে। প্রকাশ হয়েছিল বাংলাদেশ আমলে। আমি বইটি উপহার পেয়েছিলাম সম্ভবত তারও ১৬ বছর পর।
খুবই সাধারণ কাগজ, ছাপা ও বাঁধাই। যখন আমার হাতে আসে, তখন সেই বইও বহুপঠনে দুর্বল, বইয়ের গাঁথুুনিতে বয়সের ছাপ। তারপরও আমার কাছে অসাধারণ লেগেছিল। এত আগে এভাবে প্রকৃতি নিয়ে লিখছেন একজন! তিনি সাধারণ সব গাছপালার কথাই লিখেছিলেন। সবগুলো সাধারণ মানুষেরই পরিচিত। কিন্তু লেখা থেকে বোঝা যায় লেখক প্রকৃতিতে মগ্ন, বোঝা যায় শখের বশে সাময়িক মগ্ন নন, প্রতিদিন মগ্ন একজন মানুষ। রবীন্দ্রনাথ যে প্রকৃতির কথা এভাবে বলে গেছেন, ভেবে গেছেন_ দ্বিজেন শর্মার বই পড়ার আগে কারও চোখে ধরা পড়া কঠিন।
বস্তুত সেই থেকে দ্বিজেন শর্মাকে খুঁজছিলাম। পরে জানলাম, তিনি আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে, মস্কো থাকেন। প্রগতি প্রকাশনীতে কাজ করেন। কিন্তু একবার সত্যি সত্যিই দেখা হলো। বই পাওয়ার বহু বছর পরে। আমি বইটি রেখে দিয়েছিলাম। কোথাও কোথাও টেপ দিয়ে জোড়া লাগানো। বললাম, বইটি আপনাকে চেনার স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছিল। পরে তার হাতে বইটি তুলে দিয়ে একটি ছবি তুললাম।
২০১৩ সালে আমার ‘পাখিদেরও আছে নাকি মন’ বইটি প্রকাশ হওয়ার পর দ্বিজেন শর্মাকে উপহার দিয়েছিলাম। কিছুদিন পর দেখি, সংবাদপত্রে বইটি নিয়ে তিনি লিখেছেন। ঠিক প্রথাগত বুক রিভিউ নয়। আমি লেখা পড়ে অভিভূত। তিনি আমাকে কোনো আভাস দেননি যে বইটি নিয়ে লিখবেন। লেখার পরও আমাকে জানাননি। এটাই ছিল দ্বিজেন শর্মার স্টাইল। তিনি নীরবে-নিভৃতে কাজ করতেন, লিখতেন। কোনো আড়ম্বর করতেন না, কোলাহল করতেন না। তার হাত দিয়ে বের হতো অমূল্য সব সম্পদ।
দ্বিজেন শর্মার লেখা পড়ে মনে হবে, খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লেখা। পাঠকের খুবই পরিচিত আবহ তৈরি করে। কিন্তু ওইভাবে লেখা যে সহজ নয়, লিখতে গেলে বোঝা যায়। এটাও অনেকে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, প্রকৃতি বিষয়ে লেখার যে ধারা দ্বিজেন শর্মা চালু করে গেলেন, গত কয়েক দশক ধরে সেই ধারার পূর্বসূরি পাওয়া কঠিন। প্রকৃতি নিয়ে কার্যকর ও প্রজ্ঞাপূর্ণ লেখালেখি করে কম মানুষই। সেই লেখা আবার সাধারণের বোধগম্য করে লিখতে পারে আরও কম মানুষ।
আমাদের দেশে অনেক জনপ্রিয় সাহিত্যিক, শক্তিশালী প্রবন্ধকার রয়েছেন; তারা প্রকৃতি নিয়ে বলতে গেলে কিছুই লেখেননি। প্রকৃতি বিষয়ক লেখালেখিতে সাহিত্যিকদের অবদান প্রায় শূন্যের কোঠায় বললেও অত্যুক্তি হয় কি? দ্বিজেন শর্মা তাই প্রকৃতি বিষয়ক লেখার ক্ষেত্রে অগ্রদূত কেবল নন, অনন্য। আশার কথা, তরুণদের মধ্যে অনেকে এখন লিখছেন। তাদের পথ দেখিয়েছেন দ্বিজেন শর্মাই। ব্যক্তি হিসেবে তার সঙ্গ ছিল খুবই উপভোগ্য। ব্যক্তিগতভাবে তাকে হারানোর দুঃখ তো থাকবেই। তার চেয়েও বড় দুঃখ, তার শূন্যস্থান পূরণ করবে কে?
দ্বিজেন শর্মা লেখালেখির পাশাপাশি ‘তরুপল্লব’ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আরেকজন তরুণতর লেখক মোকারম হোসেন এর হাল ধরে রেখেছেন। সেখানে আমরা দ্বিজেন শর্মাকে ঘিরে অনেক কাজ করেছি। তিনি আসলে এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাকে ঘিরে অন্যরা দাঁড়াতে পারত। দ্বিজেন শর্মার মৃত্যু আমাদের জন্য বড় শোকের ঘটনা। কিন্তু স্বীকার করতে হবে, এই অনিবার্যতার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম। এখন আমাদের কর্তব্য, দ্বিজেন শর্মার জন্য শোককে শক্তিতে পরিণত করা। কীভাবে তরুণদের মধ্য থেকে আরেকজন দ্বিজেন শর্মা বেরিয়ে আসেন, সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।–সমকাল
ইনাম আল হক
পাখি ও প্রকৃতি বিশেষজ্ঞ
Posted ১২:৪৩ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
America News Agency (ANA) | Payel