শনিবার ২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

>>

মিয়ানমার নিজেকে ছিন্নভিন্ন করার শর্ত নিজেই তৈরি করছে

  |   মঙ্গলবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭   |   প্রিন্ট   |   684 বার পঠিত

মিয়ানমার নিজেকে ছিন্নভিন্ন করার শর্ত নিজেই তৈরি করছে

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সেখানকার সামরিক বাহিনীর আক্রমণ, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, হাজার হাজার নিরীহ নারী, শিশু, বৃদ্ধ রোহিঙ্গাকে নির্বিচারে হত্যার ওপর একটি বিবৃতি প্রদান করেছে। এতে বলা হয়েছে, ‘অস্ট্রেলিয়া সরকার মিয়ানমারের সেনাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। রাশিয়া আর ইসরায়েলসহ কয়েকটি দেশ দিচ্ছে অস্ত্র। ইইউ মিয়ানমারের ওপর তীব্র নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও সংস্থাটির কয়েকটি সদস্য দেশ মিয়ানমারকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সঙ্গে সামরিক সহায়তার পথ খুঁজছে’ (যুগান্তর, ১০.৯.২০১৭)। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গোয়েন্দাগিরি ও এ অঞ্চলের ফ্যাসিস্ট শাসকদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে কাজ করে থাকে। কাজেই অস্ট্রেলিয়া যা করছে তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজ বলেই ধরে নিতে হবে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বিশ্বের সরকারগুলো মিয়ানমারের সেই সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত। এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। যারা মিয়ানমারের সামরিক সহায়তার কথা ভাবছে, তাদের অবিলম্বে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।’ অন্যদিকে ব্রিটেনের লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য রুশনারা আলীর উদ্যোগে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ১৫৭ জন সদস্য এক লিখিত পত্রে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনকে বলেন, ‘জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংগঠন এবং রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর রিপোর্টের ভিত্তিতে আমরা মিয়ানমারের ইতিহাসের জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করছি।’ তারা এই পত্রে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া স্থগিত করারও আহ্বান জানান বলে ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ পত্রিকার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে। গত বছর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণে ব্রিটেন তিন লাখ ৫ হাজার পাউন্ড খরচ করেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নিধন, নির্যাতন ও বিতাড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মুখে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনসন মিয়ানমারের নেতা অং সান সু চিকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘জাতিগত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের দমন-পীড়ন তার খ্যাতিকে কলঙ্কিত করেছে।’
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিশ্বের অনেক নেতা এভাবে অং সান সু চির সমালোচনা করলেও কলঙ্কের কোনো ভয় তার নেই! কারণ নিজের কুকর্ম রক্ষার থেকে ক্ষমতার লোভ তার অনেক বেশি। ক্ষমতার জন্য তিনি শত কলঙ্ক মাথায় নিয়েও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সহযোগী হিসেবে সে দেশের বেসামরিক সরকারের নেতা হওয়া সত্ত্বেও কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের বিবেককে তিনি শিকেয় তুলেছেন। এই পরিস্থিতিতে সু চিকে ‘মানবিক’ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কোনো লাভ নেই। এর দ্বারা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সরকারের ফ্যাসিস্ট হামলা ও নির্যাতনের কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। এর জন্য দরকার সেখানকার সামরিক বাহিনীকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো তাদের বর্তমান মিয়ানমার নীতি যেভাবে কার্যকর করছে, তাতে সেখানকার সামরিক বাহিনীর কোনো বিরোধিতা তাদের দ্বারা যে সম্ভব নয়, এটা খুব স্পষ্ট।
মুসলমানদের চরম শত্রু হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং ভারতের বিজেপি ও তাদের প্রধানমন্ত্রী এখন এক কঠিন গাঁটছড়ায় বাঁধা। যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের কিছু সংখ্যক সদস্য মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সব সময় সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত। দীর্ঘদিন আগে মিয়ানমারের সামরিক সরকার মিয়ানমার থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত সব সংস্থাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে। কিন্তু এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে ঢোকার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা এই পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় যে, মুসলিম উম্মাহর নেতা হিসেবে দাবিদার সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় তারা মিয়ানমারে মুসলমানদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে প্রায় নীরবই আছে! তাদের মতো চরম প্রতিক্রিয়াশীলদের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। কাজেই তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপের আওয়াজ তোলা অথবা বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য কোনো সাহায্য পাঠানোর ব্যাপারে উৎসাহিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বলয়ভুক্ত মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলোরও একই অবস্থা।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী ও চরম সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল আরএসএস সুপ্রিম কোর্টে ভারত থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বের করে দেওয়ার জন্য মামলা দায়ের করেছে। এ কথা সকলেরই জানা যে, বিজেপি সরকার আরএসএস থেকেই প্রায় সব বিষয়ে নির্দেশ নিয়ে থাকে। তারাই হলো ক্ষমতাসীন দল বিজেপির আদর্শিক নেতা। কাজেই রোহিঙ্গাদের হত্যা করে খতম করলেও তাদের কিছু যায় আসে না। উপরন্তু তারা সেটাই চায়। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার কারণে বাংলাদেশে যে সংকটজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের ‘পরম বন্ধু’ ভারত সরকার ও তার নেতা নরেন্দ্র মোদির কিছুই যায় আসে না। চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিবৃত্ত থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে সুখের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ভারত সরকারের যা কিছু করা দরকার, সেটা করতে বদ্ধপরিকর। কাজেই লোক দেখানোর জন্য তাদের পক্ষ থেকে যদি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দূরকরণ সম্পর্কে কোনো কথা নরমভাবে এর মধ্যে বলা হয়, তাহলে সেটা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই হবে না। বহু ক্ষেত্রের মতো এ ক্ষেত্রেও ভারত বাংলাদেশের ‘বন্ধুত্বের’ স্বরূপে এর মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
কিছুদিন হলো মিয়ানমারে তেল-গ্যাসের বিশাল মজুদ আবিষ্কৃত হয়েছে। এই মজুদ কুয়েত, ভেনিজুয়েলার মজুদের থেকে কম নয়। মিয়ানমারকে ঘিরে এখন যে সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতেই রোহিঙ্গা সমস্যাকে দেখতে হবে। এই তেল-গ্যাসে ভাগ বসাতে গেলে মিয়ানমার সরকার ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের পক্ষ নেওয়া একেবারেই অসম্ভব। তবে এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে মিয়ানমারে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে, তাতে মিয়ানমার সরকার ও মিয়ানমারের বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীসহ সকলের জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে। মিয়ানমারকে ছিন্নভিন্ন করে সেখানকার শুধু তেল-গ্যাস নয়, কাঠ থেকে নিয়ে অন্য অনেক মূল্যবান সম্পদ লুটপাটের পরিস্থিতির ব্যবস্থা এখন মিয়ানমার সরকার নিজেই করছে। শুধু তাই নয়, মিয়ানমারকে এক নৈরাজ্যের দেশে পরিণত করার শর্ত এর দ্বারাই সৃষ্টি হচ্ছে।

বদরুদ্দীন উমর
সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

Facebook Comments Box

Comments

comments

Posted ১১:৩২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

America News Agency (ANA) |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Dhaka University Centennial & New Beginnings
(13555 বার পঠিত)
স্বামী তুমি কার?
(12861 বার পঠিত)
দল বেঁধে সৈকতে
(1424 বার পঠিত)
[abm_bangladesh_map]
Editor-in-chief :
Sayeed-Ur-Rabb
Corporate Headquarter :

44-70 21st.# 3O1, LIC. New York-11101. USA,

06463215067

americanewsagency@gmail.com

Copyright © 2019-2025Inc. America News Agency (ANA), All rights reserved.ESTD-1997