শিরোনাম

প্রচ্ছদ খোলা কলাম, শিরোনাম

করোনায়ও এদিক-ওদিক সাংবাদিক নিপীড়ন

মোস্তফা কামাল : | বুধবার, ১৩ মে ২০২০ | সর্বাধিক পঠিত

করোনায়ও এদিক-ওদিক সাংবাদিক নিপীড়ন

করোনার এই মহামারীতে কোথায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন? অনেকে জানেনও না এমন একটি জনবান্ধব আইন দেশে রয়েছে। দুর্যোগ কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, কার কী দায়িত্ব, স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধিরা কী করবেন? সব বলা আছে আইনটিতে অথচ তাদের এ আইন প্রয়োগে গরজ নেই।

সরকারের যত আগ্রহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দিকে। এদিকে-ওদিকে সাংবাদিক নামের নিরীহ জীবদের দিকে। ধরার আগে, অভিযোগের যৌক্তিকতার বিষয়ে কোনো কথা বলা হচ্ছে না। ‘ভাবমূর্তি ক্ষু্ন্ন হওয়া’, ‘গুজব ছড়ানো’, অথবা ‘সরকারের সমালোচনা’ করার মতো কারণকে সাংবাদিকদের জেলে ভরতে যথেষ্ট মনে করার উন্মোদনা বাজে ইঙ্গিত দিচ্ছে।



ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা মানেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখন গ্রেফতার হওয়া। বিদ্যমান মানহানির মামলার পরিবর্তে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ঠোকার মধ্যে সাংবাদিকদের ভয় দেখানো ও হয়রানির মানসিকতা স্পষ্ট। মামলা ছাড়াও সাংবাদিকদের টুঁটি চেপে ধরা খুব সোজা কাজ।

মার দেয়াও কোনো বিষয় নয়। যে ইচ্ছা সে-ই করতে পারে। এর কোনো বিচার বা বিহিত হয় না। কার্যকর প্রতিবাদও হয় না। সুকুমার রায়ের ছড়ার মতো এরা করে নাকো ফোঁসফাঁস, মারে নাকো ঢুশঢাশ। করোনা দুর্যোগে মানবিক আচরণের প্রকাশ ঘটেছে পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমে। মানুষ মন থেকে ভালোবেসেছে পুলিশকে।

ঘটনার এ সন্ধিক্ষণ ভয়ের বদলে ভরসা এনেছে পুলিশের ওপর। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র তো পুলিশকে ব্যবহার করতে চায় অন্যভাবে। মানুষের সেবার চাইতে রাষ্ট্রের নিপীড়নের হাতিয়ার হিসাবে পুলিশ এই দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ব্রিটিশ আমল থেকে। করোনার মধ্যেও সেই একই ধারা।

কুখ্যাত ৫৭ (৩২) ধারা যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার। সেই কলংকিত ধারায় আজ বন্দি দিদার ভুঁইয়া, কার্টুনিস্ট কিশোর, সাংবাদিক কাজল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এ আটক কিশোর একটা ভয়ঙ্কর অপরাধী। সে কার্টুন আঁকতো! পেন্সিল দিয়ে কাগজে কার্টুন আঁকতো! কী ভয়াবহ ব্যাপার! তাই তেড়ে মেরে ডাণ্ডায় ঠাণ্ডা করে দেয়া?

ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যসংবলিত কোনো পোস্ট দেওয়া ও সে ধরনের পোস্টে লাইক বা শেয়ার করা থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরত থাকার নোটিশটি জারি হয়েছে ৭ মে। কেউ তা না মানলে কঠোর ব্যবস্থার বিধান।

ট্রাম্পের দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও প্রেসিডেন্টের বাস ভবনের সামনে মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করছে। কার্টুন-ব্যাঙ্গ করছে। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গদি চলে যাচ্ছে? গ্রেফতার বা ভয় দেখিয়ে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া, গুজব ছড়ানো বা সরকারের সমালোচনা বন্ধ হয় না। ভয়ে গঠনমূলক সমালোচনাও বন্ধ হয়ে গেলে বরং সরকারের ক্ষতি হয়।

নোটিশটি জারি হয় এমন দিনে, যে দিনে ফেসবুকে সরকার অথবা কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা তাদের কাজের সমালোচনা এবং ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে এক দিনে ঢাকায় ১১ জন এবং অন্যান্য জায়গায় আরও অন্তত ৪ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তার আইনে মামলার বিষয়টি শহরে সবার মধ্যে আলোচিত হচ্ছিল।

এসব আলোচনা বেশিরভাগই সামাজিক মাধ্যমে, কিছুটা টেলিফোনে আর কিছুটা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। মামলা দেওয়ার আগে কোনো ধরনের গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া লেখক, কার্টুনিস্ট, ব্যবসায়ীসহ কয়েকজনকে সাদা পোশাকের লোকজন বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা গোটা পরিস্থিতির মধ্যে নতুন মাত্রা।

অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, এই রকম আইন থাকলে এর উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রয়োগ ঘটবেই। এটা ইতিহাসের শিক্ষা। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগ তৈরি করেছিল বিশেষ ক্ষমতা আইন। সেই আইনে ২২ বছর ধরে সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত হয়েছিল আওয়ামী নেতাকর্মীরা। সঙ্গে অন্যরাও।

অন্যের জন্য কুয়া খুঁড়লে সেই কুয়াতে নিজেদেরও পড়তে হয়- সেই প্রবাদ বাক্যের জীবন্ত উদাহরণ সেই বিশেষ ক্ষমতা আইন। ডিজিটাল আইনের ৫৭ (৩২) ধারাও সেই পরিস্থিতি তৈরি করছে। সরকারি যে কোনো তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত করা একটা সংস্কৃতির মতো। সেটা করোনায় আক্রান্ত, শনাক্ত, মৃত্যু ইত্যাদি নিয়েও।

আবার শুরু থেকেই এ সংক্রান্ত সরকারি তথ্য কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ। কেউ কেউ বলতে চান, এসব সংখ্যা কমিয়ে বলা হচ্ছে। তাহলে বাড়তি বা প্রকৃত সংখ্যাটি কত? তাও বলতে পারছেন না প্রশ্ন উত্থাপনকারীরা। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে করোনায় মৃত, শনাক্ত, আক্রান্ত ইত্যাদির যে তথ্য দেয়া হচ্ছে সেটাই আমলে নিতে হবে।

এর বিকল্প নেই। কিন্তু করোনা নিয়ে ‘গুজব-অপপ্রচার’ নিয়ে সরকার অতিমাত্রায় কঠোর শুরু থেকেই। এ ক্ষেত্রে সরকার সংকীর্ণতায় ভুগছে। তথ্য অবাধ না রাখলে বিকৃত হয় বেশি। ভাইরালও হয়। এবারও তাই হয়েছে। সরকার সেটা সহ্য করতে নারাজ। অতএব করোনার মহামারীতেও ধরপাকড় থেকে রেহাই নেই ফ্রন্টলাইনে কাজ করা গণমাধ্যমকর্মীদের।

সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেও চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের এভাবে টার্গেট না করলে হতো না? করোনায় মৃত্যুর শিকার পুলিশ, ডাক্তার, আমলাসহ বিভিন্নজনের পরিবারকে প্রণোদনার ঘোষণা এসেছে। সরকারি কোনো কর্মকর্তা করোনা আক্রান্ত হলে পাঁচ থেকে ১০ লাখ এবং করোনায় মৃত্যুবরণ করলে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বীমা সুবিধা পাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বলা হয়েছে, করোনা সংক্রমিত হয়ে কেউ ঘরে থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও তিনি এই সহায়তা পাবেন। হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন। সাংবাদিকরা কি এর আওতায় আছেন? অন্যদের বীমা, প্রণোদনা এবং ঝুঁকিভাতার সংবাদ প্রচার করবেন সাংবাদিকরা।

দেশের মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বানে ভূমিকা রাখবেন। এটা তাদের দায়িত্ব। আর এই করোনাকালেও চাকরিচ্যুত হওয়াও তাদের প্রাপ্য। সেই সঙ্গে উপরি পাওনা নেতা-মন্ত্রীদের শোক-সমবেদনা-বিবৃতি।

অস্তিত্বের প্রশ্নে লাঞ্ছিত-নিগৃহীত সাংবাদিকসহ গণমাধ্যমে কর্মরতদের নিজেদের মধ্যে বসার দরকার আছে। নিজেরা নিজেরা আলাপ করে দেখতে পারেন আমরা কি কেবল মন্ত্রী, পুলিশ-র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনের জনসংযোগ রিপোর্ট করব? র‌্যাব-পুলিশ সংবাদ সম্মেলনের নামে ডেকে নিয়ে কিছু ধরপাকড় ও উদ্ধারের তথ্য না দেওয়া পর্যন্ত কিচ্ছু জানেন না সাংবাদিকরা? মানুষ তা ভালোভাবে নিচ্ছে না।

ঢাকা শহরে ক্যাসিনো জোয়ার সাংবাদিকরা জানলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর। র‌্যাব ডেকে নিয়ে নোটটা ধরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত সাংবাদিকরা জানতেন না- সম্রাট, খালেদ বা পাপিয়া নামে কেউ ছিল। তাদের কোনো সাম্রাজ্য ছিল।

সরকারের চাপে রিপোর্ট করতে পারেন না- এমনটি যারা বলতে চান, কাশি দিয়ে জোরে বলুন। জোর গলায় বলবেন না, আবার সরকারের গুডবুকে থাকবেন সব একসঙ্গে মানায় না। গুলির শব্দে কাপড় নষ্ট হলে তার সৈনিক না হওয়া নিরাপদ।

ব্যক্তিগতভাবে কারো পছন্দ-অপছন্দ যা-ই হোক, গোটা বিশ্বেই ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন জনপ্রিয়। অনিবার্য, অপরিহার্য। নিজের বুঝমতো দূরে থাকলে ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যমের কিছু যাবে, আসবে না। অবস্থার অনিবার্যতায় ফেসবুক, গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তফাৎ পেঁচিয়ে গেছে।

ফেসবুকের কোনো সম্পাদক না থাকায় এর কর্তৃপক্ষ নেই। জবাবদিহিতা নেই। দায়িত্বশীলতাও নেই। ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে ঘুরে বেড়ায় অনেক ফেক নিউজ, ভুল তথ্য, বিকৃত তথ্য। ফেসবুকের এই চাপে মূলধারার গণমাধ্যমও আক্রান্ত। নিজেদের দায়িত্বশীলতা ভুলে ফেসবুক স্টাইলে ঝটপট নিমিষে নিউজ করে ফেলার একটা ব্যারাম চেপেছে। দায়িত্বশীলদের ভুল-ত্রুটি, অনিয়ম, অন্যায় তুলে ধরা গণমাধ্যমের কাজ।

ক্ষেত্রবিশেষে গণমাধ্যম সেই অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। নানা অনিয়ম-দুর্নীতির আশপাশে বা সহযোগী থেকে হঠাৎ হঠাৎ জাতির বিবেকের শোডাউন বেমানান। দুর্নীতিবাজরাও এতে গোস্যা করে। ক্ষমতাধররা আরেকটু আগে বেড়ে উচিত শিক্ষা দেয়ার সুযোগ খোঁজে।

কাউকে দেখে নেওয়া বা শুইয়ে দেওয়ার উভয়পক্ষীয় এ প্রতিযোগিতা পেশাদার সাংবাদিকতাকে মাঠে মেরে ফেলার তেমন আর বাকি রাখেনি। এতে সত্য প্রচার করলেও গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার তেজটা দিনে দিনে কেবল বাড়ছে। কর্মক্ষেত্রের বাইরে মাঝে মধ্যে মার খাওয়া, অপদস্থ হওয়া আর কর্মস্থলে বেতন না পাওয়া, চাকরি যাওয়াকে কেউ কেউ সাংবাদিকতার ঐতিহ্য বলতে চান।

তাদের কথার মর্মার্থ হচ্ছে হাতে হাতকড়া বা কোমরে দড়ি নিয়েই দুনিয়াতে সাংবাদিকতার অভিষেক। কিন্তু এটা দুর্যোগ-দুর্বিপাক। মোটেই ঐতিহ্য বা বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। হতে পারে অপদস্থ-তাচ্ছিল্য করা সাংবাদিকতায় আচমকা বা নতুন ঘটনা নয়।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হাতকড়া পরিয়ে তুলে নেওয়া, কর্মস্থল থেকে ঘাড় ধরে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে আমরা পরিচিত। করোনার এই দুর্যোগেও সেটার ভিন্ন মাত্রা দেখা যাচ্ছে। সাংবাদিকদের ত্রাণ-দানে ধন্য করার কুচেষ্টা চলছে। আবার ঘাড় ধরে সিধা রাখার চেষ্টায়ও কমতি নেই বরং চেষ্টাটা আরো জোরদার।

দুঃখজনকভাবে সাংবাদিকদের কষ্টের ঘটনা হাসির জোগান দিচ্ছে। মানুষ আফসোসের বদলে টিপ্পনি কাটে। মজা নেয়। অতি উদাম হয়ে নিজের ওজন নিজে শেষ করে দেয়া যে কারো জন্যই বিধ্বংসী।

তার বা তাদের ন্যায্য দামটাও তখন হারিয়ে যায়। মাগনাও বিকাতে চায় না। ব্যবহারকারীও তখন উপযোগিতা মানতে চায় না। ট্র্যাজেডি হয়ে যায় কমেডি। প্রসঙ্গে হুবহু না মিললেও গৃহস্বামীর কাছে এক কাজের মেয়ের বিয়ে পরবর্তী আফসোসের জোকসটা সংবরণ করা যাচ্ছে না।

…বিয়ের পর মেয়ের পরিবার আর বান্ধবীরা জানতে চায় এখন দিনকাল কেমন যাচ্ছে? জবাবে মেয়ে বলে- আগের মতনই। তয় হিসাবে লস হয়ে গেছে। সেটা কেমন? কিছুক্ষণ ভেবে মেয়ে জানায়, আগে কাজের বেতন পেত। বাড়তি কামে বখশিশ পেত। এখন সবই করা লাগে কিন্তু বেতন-বখশিশ কিচ্ছু নাই।

লেখক: মোস্তফা কামাল- সাংবাদিক-কলামিস্ট, বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

Comments

comments



আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১