বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

>>

মৃত্যুর পথ থেকে ফেরানোর উপায় কী

এনা অনলাইন :   |   শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯   |   প্রিন্ট   |   727 বার পঠিত

মৃত্যুর পথ থেকে ফেরানোর উপায় কী

কত প্রকারের সংবাদ নিয়ে যে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়, বলে শেষ করার নয়। হাসি-কান্না, আনন্দ-বিষাদ, প্রাপ্তি-বঞ্চনা, মিলন-বিচ্ছেদ- কী নেই! মানবজীবন ঘিরে যা ঘটে, সব থাকে পত্রিকায়। সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব পরিমণ্ডল- সবকিছুর সংবাদ জায়গা পায় একটি সংবাদপত্রে। মানুষের আবেগ, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, মূল্যবোধ, ক্ষমতার পালাবদল- কত কী! কোনো খবর আমাদের আনন্দ দেয়, কোনো খবর আবার আমাদের মনকে বিষাদে আচ্ছন্ন করে।
কিন্তু এত সব খবরের মাঝে একটি খবর, যা ইদানীং সংবাদপত্রে খুব বেশি বেশি দেখা যায়, আমাদের মনকে খুব গভীরভাবে খারাপ করে দেয়। খবরটি মূলত তরুণ-যুবকদের নিয়ে। মন খারাপ হয়, কেননা আমরা শৈশব থেকেই জেনে এসেছি যে তরুণরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী। একটি দেশের মানদণ্ড নাকি দেশের তরুণ এবং যুবকেরা। সেই তরুণেরা দেশে থাকতে চাইছে না। সহায়-সম্বল, ভিটেমাটি সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে হলেও তারা বিদেশে পাড়ি দিতে চায়। ওইসব তরুণ-যুবকেরা দেশে আর নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখে না। অনিশ্চিত যাত্রার মধ্যেই তারা নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু যেসব খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় তাদের দেশত্যাগ নিয়ে, তা দেশে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চেয়েও ভয়ংকর। অধিকাংশের স্বপ্নভঙ্গ হয়। দুর্গম পাহাড়ি পথে, জঙ্গলে, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরে অনেকেই প্রাণ হারায়। অনেকে অচেনা দেশে জেলখানায় বন্দিজীবনে পচে মরে। ভাগ্যগুণে দু-চারজনের দেশে ফিরে আসার খবর মেলে। আর যাদের ভাগ্য আরও ভালো, তেমন দু-একজন তাদের স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। যত দূর জানা যায়, দেশে পড়ে থাকা হতাশ যুবকদের বিদেশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখায় এক শ্রেণির দালাল। শুধু বাঙালি দালাল নয়, বিভিন্ন দেশের দালালরা মিলে সংঘবদ্ধভাবে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর যুবকদের সর্বনাশের ফাঁদ পাতে। পথে পথে যে তাদের জন্য বিপদ ওত পেতে থাকে, যাত্রাপথের যে জটিলতা, আইনের বিধিনিষেধ, জলে-স্থলে আজরাইল, এক দেশ থেকে আরেক দেশে প্রবেশে যত সব নিষেধাজ্ঞা-দালালরা সবকিছু আড়াল করে হতাশায় ডুবে থাকা যুবকদের কেবল আকাশের চাঁদ ধরার স্বপ্ন দেখিয়ে উদভ্রান্ত করে দেয়! তারা সেই পোকার মতো আলোয় ঝাঁপ দিয়ে পড়ে এবং মৃত্যুকে, বঞ্চনাকে, ধোঁকাবাজিকে বরণ করে নেয়। কোনো কোনো জঙ্গলে এসব হতাশ অসহায় যুবকদের গণকবরের পর্যন্ত সন্ধান মেলে!
তা সত্ত্বেও প্রায় প্রতিদিন এ জাতীয় হৃদয়বিদারক সংবাদ আমাদের সংবাদপত্রে পাঠ করতে হয়। টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে হয় মর্মস্পর্শী সব দৃশ্য। পিতা-মাতা, ভাই-বোনের আহাজারি। এ রকমই একটি সংবাদ ঠিকানার ২১ জুন সংখ্যার ৩৯ পৃষ্ঠায় ৫ কলামজুড়ে ছাপা হয়েছে। সংবাদটির শিরোনাম : ‘ইউরোপের দালালদের টার্গেট বাংলাদেশি তরুণ-যুবকরা।’ দুঃস্বপ্নের এক ভয়ংকর ঘটনা। যাদের স্বপ্ন পুড়ছে, সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসেছে যারা, যারা সন্তান, ভাই, স্বজন হারিয়েছে, তাদের কথা থাক, যারা দূরের মানুষ, তাদের পক্ষেই এমন দুর্ভাগ্যের সংবাদ সহ্য করা কঠিন। ভাবতে বিস্ময় জাগে, মানুষ কী করে অমন অমানুষে পরিণত হতে পারে! পশুর সঙ্গে ওদের তুলনা করলেও পশুকে অসম্মান করা হবে, ওরা এতটাই অধম। ওরা মানুষ নামের কলঙ্ক।
সংবাদটির শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আসার প্রলোভনে দালালদের খপ্পরে পড়ে পুড়ছে হাজারো বাংলাদেশি তরুণ-যুবকের স্বপ্ন। জকিগঞ্জের একজন সামাদ। সিলেটের ফিরোজ। এমনি কত শত যুবক। তারা তাদের দুঃসহ অভিজ্ঞতার যে বর্ণনা দেন, তা শুনেই গা শিউরে ওঠে। প্রতি পদে মৃত্যুর হাতছানি। ছয় মাসের বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় ইউরোপে। সারা দিন জঙ্গলে শুয়ে থেকে সারা রাত হাঁটা। ১০ দিন টানা এভাবে চলা। এর মধ্যে খাদ্যসংকট, যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যুশঙ্কা।
গত মে মাসে এভাবে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারায় ৬০ জনেরও বেশি অভিবাসীপ্রত্যাশী। এদের বেশির ভাগই ছিল বাংলাদেশি। যারা এ রকম ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার, তাদের পরামর্শ এ রকম জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সর্বস্ব দালালের হাতে তুলে দিয়ে কেউ যেন অজানা গন্তব্যে পা না বাড়ায়। উচ্চাভিলাষী জীবনের স্বপ্নে বিভোর এসব তরুণ-যুবকের অধিকাংশের জীবনে নেমে আসে দুঃস্বপ্ন। অনেকের স্বপ্নের সমাধি ঘটে করুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। দালালরা জানে, টাকা-পয়সা নিয়েই স্বর্গসুখের স্বপ্নে বিভোর যুবকের ঘর ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়িয়েছে! তাদের লোভের দৃষ্টি থাকে ওই অর্থের দিকে। মানবতা, মূল্যবোধ এসব মূল্যহীন ওইসব অর্থলোলুপ দালালের কাছে। তারা ছলেবলে, মিথ্যায়, সেই অর্থ হাতিয়ে নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। কারও জীবনের, নীতিকথার কোনো মূল্য নেই ওদের কাছে। স্বপ্ন দেখা যুবকদের স্বপ্নকে আরো চওড়া করে দিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই ওদের একমাত্র লক্ষ্য। এবং লোভ দেখিয়ে হোক, আর ভয় দেখিয়ে, একবার ঘরছাড়া মানুষদের অর্থ হাতিয়ে নিতে পারলেই ওরা ধরাছোঁয়ার বাইরে!
দালালদের খপ্পরে ইউরোপে যাওয়া এক যুবকের বর্ণনা : ‘দালালদের হাতে পড়ে তার ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন এখন ধূলিসাৎ। অনেকের বয়ানে জানা যায়, ইউরোপে যাওয়ার অভিযানে তারা কোনোভাবে যমের হাত এড়িয়ে, মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে পারলেও দালালদের হাত থেকে রক্ষা মেলা কঠিন। দালালদের হাত এতটাই লম্বা যে কেউ যদি তাদের সম্পর্কে কোনো কর্তৃপক্ষকে কোনো তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের প্রাণে মেরে ফেলার শুধু হুমকিই দেয় না, সে হুমকি প্রয়োজনে বাস্তবে রূপ দিতেও দ্বিধা করে না। সে কারণে পুলিশ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ দালাল সম্পর্কে উপযুক্ত তথ্য না পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নিতে পারে না। দালালরা অনেক সময় মুক্তিপণ দাবি করেও বিপদগ্রস্ত যুবকদের আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে থাকে। নানা কৌশল নিয়ে দালালরা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। কোনো কোনো সময় মূল দালালদের দু-একজন স্থানীয় এজেন্ট ধরা পড়লেও দালালদের চাঁইয়ের সন্ধান মেলে না। সে কারণে এই দালাল ব্যবস্থাকেও ভাঙা সম্ভব হয় না।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী ভ‚মধ্যসাগর দিয়ে যত মানুষ ইউরোপে ঢোকে, সেই তালিকার শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। এই সংস্থার তথ্য থেকে পাওয়া যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ১২৬ জন! এর মধ্যে মুষ্টিমেয় কিছু যুবক স্বপ্নরশি ছুঁতে পারলেও অধিকাংশের স্বপ্নই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যে অনেকেই জীবন দিয়ে স্বপ্নের মূল্য চুকিয়েছে। পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজনের চোখের জলে অনেকের স্বপ্ন ধুয়ে গেছে। অনেকেই সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার কোনো জোড়াতালি সমাধান নেই। যত দিন সংকটের মূলে হাত দিয়ে সমাধানের ব্যবস্থা না নেওয়া হবে, তত দিন এই স্বপ্নদেখা যুবকদের দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হতে দেখা যাবে। সংকটের গোড়ায় দৃষ্টি দিয়ে দেখতে হবে কী কারণে দেশের তরুণ-যুবকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও তারা যেকোনো উপায়ে স্বদেশ-স্বজন ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে দালালের ফাঁদে পা দেয়।
এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, দেশের মধ্যে যখন কোনো তরুণ বা যুবক ভবিষ্যৎ দেখতে না পায়, চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য করে নিজের বাবা-মায়ের সুখের সন্ধান না পায়, তখন কোনো ভয় বা উপদেশ-পরামর্শই তাদের ঘর ছাড়ার পথ থেকে নিবৃত্ত করতে পারে না। জলে ডোবা মানুষ খড়কুটো ধরেও বাঁচতে চায়। সে কারণেই সব বিপদ জেনেও তারা দালালদের প্রলোভনে সাড়া দিয়ে ঘর ছাড়ে। সামাজিক অসম্মান, অমর্যাদা, অবজ্ঞা আর অবহেলা সইবার চেয়ে মৃত্যুর ভয় তুচ্ছ করে অজানার পথে পা বাড়ানোই শ্রেয়তর মনে করে।
তাই দেশের ভবিষ্যৎ যুবসমাজকে রক্ষা করার জন্য দেশের ভেতরে প্রথম তাদের স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে। বিদেশে যেতে হলেও সরকারের ব্যবস্থাপনায় এমন নিশ্চিত ও নিরাপদ চ্যানেল থাকবে, যাতে যুবশ্রেণি আস্থা রাখতে পারে। বিষয়টি বাতকে বাত হলে স্বপ্ন দেখা যুবকদের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না।

Facebook Comments Box

Comments

comments

Posted ৮:২২ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

America News Agency (ANA) |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Dhaka University Centennial & New Beginnings
(13551 বার পঠিত)
স্বামী তুমি কার?
(12860 বার পঠিত)
দল বেঁধে সৈকতে
(1423 বার পঠিত)
[abm_bangladesh_map]
Editor-in-chief :
Sayeed-Ur-Rabb
Corporate Headquarter :

44-70 21st.# 3O1, LIC. New York-11101. USA,

06463215067

americanewsagency@gmail.com

Copyright © 2019-2025Inc. America News Agency (ANA), All rights reserved.ESTD-1997