বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

>>

রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোর চেতনার বহুমুখিতা

সালাহ্ উদ্দিন নাগরী :   |   রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯   |   প্রিন্ট   |   587 বার পঠিত

রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোর চেতনার বহুমুখিতা

অগ্নিঝরা মার্চ, আমাদের স্বাধীনতার মাস। আমাদের অঙ্গীকার ও শপথ গ্রহণের মাস। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি অবিচল আস্থা, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের লালিত মূল্যবোধ রক্ষা ও সমুন্নতকরণ, সব ধর্মমতের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন এবং সমতাভিত্তিক ও শোষণমুক্ত জাতি গঠনই হল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা দিবসের দীক্ষা। রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোর চেতনার প্রতি আমাদের ভক্তি-ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে। কিন্তু ওইসব দিবস উদযাপন করে রাতে ঘুমিয়ে সকালেই দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে আমরা কেন জানি দূরে সরে যেতে থাকি।

আমরা অনেকেই ধরে নিই- স্বাধীনতার চেতনা ও দেশপ্রেম প্রকাশ করার জন্য শুধু ওই কয়েকটি দিনই নির্ধারিত আছে; কিন্তু ওই দিবসগুলো পালন করলেই ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ ও দেশপ্রেমের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা সম্পন্ন হয়ে গেল মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রকৃতপক্ষে একজন নাগরিক যেন সারা বছর দেশপ্রেমের চেতনায় স্থির, অবিচল থেকে মা-মাটি-মানুষের প্রতি যথাযথভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে পারে, ওই নির্দিষ্ট দিনগুলো তার প্রশিক্ষণ দেয়, শক্তি ও অনুপ্রেরণা জোগায়।

আমরা অনেকেই জানি না কীভাবে চেতনাকে ধারণ করব। কীভাবে প্রতিদিন চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাব। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ ও বৃহত্তর পরিবেশে কীভাবে এ চেতনা সারা বছর জারি রাখব? আমরা বুঝি না কোন ভাবনা, প্রচেষ্টা ও কাজের মধ্যে চেতনা জড়িয়ে আছে। চেতনা হল ব্যাপক ও বিস্তীর্ণ একটি অনুভূতি; এর গভীরতা আছে, বিরাটত্ব আছে। জীবনের ভালো সব কাজের সঙ্গে চেতনার সম্পর্ক আছে। দিনযাপনের প্রতিটি অনুষঙ্গেই চেতনাকে শ্রদ্ধা জানানো, ধারণ, লালন এবং প্রয়োগের পথ ও পদ্ধতি আছে। দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত মানুষকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিতে হবে, সূচনাটা করিয়ে দিতে হবে, প্রাপ্তি আপনাআপনি আসবে।

আমাদের খেটে খাওয়া মানুষের কারও কারও মধ্যে সন্তানকে স্কুলে না পাঠানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। অনেকেই স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ দেয় না, নেশায় আসক্ত হয়ে স্ত্রীকে অযথা মারধর করে। ওই মানুষটির মধ্যেও দেশের জন্য ভালো কিছু করার আকাক্সক্ষা থাকতে পারে; কিন্তু তাকে কখনোই বোঝানো হয়নি- তার জন্য দেশপ্রেম হল, নেশার আসক্তি থেকে বের হয়ে আসা, স্ত্রী-সন্তানকে ভালোবাসা, তাদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করা ও সন্তানকে স্কুলে পাঠানো।

মানুষের দ্বারে দ্বারে হাতপাতা ভিখারিদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব যে সামর্থ্যবানদের চেতনায় স্থান পাওয়া দরকার, তা তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। মনে রাখা দরকার, স্বনির্ভর জাতি গঠন আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। ‘পৃথিবীর সব ঘড়ি যদি আবার উল্টো ঘোরে ঠিক ঠিক যাবো মুক্তিযুদ্ধে কোন একদিন ভোরে’ মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের তেজোদীপ্ত ও লড়াকু এ মনোবৃত্তিকে কাজে লাগাতে হবে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ যেসব কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, সেসব কাজের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যায়। দেশোন্নয়নের প্রতিটি কাজের মধ্যেই চেতনা জড়িয়ে আছে। একজন সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি, সরকারি ভূমি দখলকারী, কালোবাজারি, মাদক ব্যবসায়ী, খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণকারী বা এদের যারা পৃষ্ঠপোষক ও সমাজে অশান্তি সৃষ্টিকারীরা যদি ওইসব কর্মকাণ্ড থেকে ফিরে আসে, তবে সেটাই হবে তাদের চেতনা বহিঃপ্রকাশের উত্তম পথ। সমাজের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থেকে শহীদ মিনারে, স্মৃতিসৌধে যাওয়া যায় না, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নৈতিক অধিকার থাকে না।

২০১৬ সালে শুরু হওয়া জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট যেমন দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, দুর্নীতিমুক্ত দেশগড়া, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য অভীষ্ট অর্জনের কাজগুলো সততা-আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ কাজগুলোর মধ্যে নিহিত আছে আমাদের স্বাধীনতার চেতনা এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা। আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে ভিনদেশের টিভি চ্যানেলগুলো আমরা প্রতিদিন রুটিনমাফিক উপভোগ করছি। শাশুড়ি-বউ ও ভাবি-ননদ দ্বন্দ্ব, পরকীয়ায় ভরপুর নাটক ও সিরিয়ালগুলো আমাদের মূল্যবোধ, ঐতিহ্য-আচার অনুষ্ঠান ও চেতনার সঙ্গে খাপ খায় না। ‘খোলা দুয়ার’-এর দোহাই দিয়ে আমরা এ বিষয়ে আর কতকাল মৌন থাকব? মৌনতা একটু দীর্ঘ হলে কিন্তু সম্মতির পর্যায়ে পড়ে যায়।

বিশ্ব এখন ‘গ্লোবাল ভিলেজে’ পরিণত হয়েছে। আমরা হয়তো চেষ্টা করেও অনেক কিছু আটকাতে পারব না। ধীরে ধীরে ঢুকে পড়বে; কিন্তু তাই বলে ‘বানের লাহান’ দু’কুল ছাপিয়ে সবকিছু গ্রাস করবে, তাতো হতে পারে না। বিদেশে একজন গর্ভবতী মায়ের সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে তার স্বামীর সামনে সম্পন্ন করানো হয়। বিষয়টি ভালো, এতে স্বামী তার স্ত্রীর কষ্ট বুঝতে পারে, তার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা বাড়ে। কিন্তু আমাদের দেশে গর্ভবতী মায়ের মহিলা ডাক্তারের কাছে রুটিন চেকআপের কার্যক্রমটি ‘স্বামী’ ব্যক্তিটিকে সরিয়েই সম্পন্ন করা হয়, এখানেই অন্যান্য দেশের জনগণের সঙ্গে আমাদের মানসিকতার র্পাথক্য। যে কাজগুলোকে আমাদের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও চেতনা সমর্থন করে না, তাকে সরাসরি ‘না’ বলতে হবে। মনে রাখতে হবে, অন্যের স্বাধীনতা আমার নাকের ডগা পর্যন্ত, তার বেশি না। আমাদের গর্ব করার বন্ধনগুলো আলগা হয়ে যাবে, তা মেনে নেয়া যায় না। আমাদের সচেতন সুধীমহল বিষয়গুলো ভেবে দেখলে চেতনাকে সম্মান করা হবে বলে বিশ্বাস করি।

বিশ্বব্যাপী বিশেষত উপমহাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছে, এটা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের লালিত চেতনা ও দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। সব ধর্মমতের মানুষের স্বাধীনভাবে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের শ্রেষ্ঠ পীঠস্থানের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ওপরে তুলে ধরতে হবে। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি সৎ চিন্তা, সৎ উদ্যোগ ও সৎ কাজের সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোর চেতনা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। যার যেটুকু দায়িত্ব, সেটা যদি সততা, আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়, নিজের প্রসারিত দু’হাত যতদূর পৌঁছে, সে জায়গাটুকু যদি সবার জন্য নিরাপদ রাখা যায়, কোনো অজুহাতে দু’হাতের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করা না হয়; তবে সেটাই হবে চেতনা ধারণ করার উৎকৃষ্ট নির্দশন।

বৈধভাবে প্রত্যেক মানুষের সার্বিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনই হল দেশোন্নয়নের সহজ ব্যাখ্যা। আর দেশোন্নয়নের সব উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও কাজ তো আমার চেতনারই বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত। একজন মানুষ যদি সহিভাবে শুধু আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টায় রত থাকে, তাহলে প্রকারান্তরে সেটাও তো দেশোন্নয়ন।

কয়েকদিন আগে রিকশায় বাসায় ফিরছি, যানজটের কারণে ১০ মিনিটের পথ পার হতে প্রায় ২৫ মিনিট লেগে গেল। রিকশাচালকের বয়স একটু বেশি মনে হওয়ায় তার নাম ও বয়স জিজ্ঞেস করলাম। ৭০-৭২ বছরের আবদুল বারেক মিয়ার সঙ্গে ওই সময়ের মধ্যে অনেক কথা হল। তাকে বললাম- এটা তো স্বাধীনতার মাস, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাস, জানেন কি? উত্তরে বললেন, জানি। দেশোন্নয়নে আপনার ভাবনা কী? বললেন, সারা দিন খাইট্যা মরি, এসব নিয়ে ভাবার সময়-সুযোগ কোথায়? জানতে চাইলাম, এ বয়সে এত কঠিন কাজ করছেন, ছেলেমেয়েরা দেখে না? বারেক মিয়া নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, জি না; তবে আমি আর আমার স্ত্রী ভালোই আছি। বললাম, এ বয়সে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দু’জনের অন্নের সংস্থান করে চলছেন, অন্যের গলগ্রহ বা অনুগ্রহের পাত্র না হয়ে, থরথর কাঁপা হাত দুটিকে কর্মীর হাতে পরিণত করেছেন; এর থেকে বড় দেশসেবা ও দেশোন্নয়ন আর কী হতে পারে! লাখো সালাম আপনাকে, পরম শ্রদ্ধেয় আবদুল বারেক মিয়া।

সালাহ্ উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

snagari2012@gmail.com

Facebook Comments Box

Comments

comments

Posted ২:৫৬ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯

America News Agency (ANA) |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Dhaka University Centennial & New Beginnings
(13551 বার পঠিত)
স্বামী তুমি কার?
(12860 বার পঠিত)
দল বেঁধে সৈকতে
(1423 বার পঠিত)
[abm_bangladesh_map]
Editor-in-chief :
Sayeed-Ur-Rabb
Corporate Headquarter :

44-70 21st.# 3O1, LIC. New York-11101. USA,

06463215067

americanewsagency@gmail.com

Copyright © 2019-2025Inc. America News Agency (ANA), All rights reserved.ESTD-1997