শুক্রবার ১ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

>>

দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতা দুই-ই জরুরি

ড. মো. মিজানুর রহমান   |   রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮   |   প্রিন্ট   |   692 বার পঠিত

দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতা দুই-ই জরুরি

প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ঈদ উপলক্ষে ঢাকা শহর ত্যাগ করে নাড়ির টানে; আপনজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। কিন্তু অনেক সময় এই আনন্দযাত্রা বিষাদময় হয়ে ওঠে, যখন ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময় অথবা বাড়ি থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারাত্মক আহত বা নিহত হন। যে কোনো মৃত্যুই যন্ত্রণাদায়ক, বেদনাবিধুর। কিন্তু সেই মৃত্যু যদি আবার ঘটে কোনো উৎসবে অংশগ্রহণের নিমিত্তে যাত্রাপথে, তখন তা সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছর ঈদের আগে-পরে সড়কপথে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। বাড়ে হতাহতের সংখ্যা। ফলে ঈদের আনন্দের পরিবর্তে কারও কারও পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।

বিগত বছরগুলোতে ঈদের আগে-পরে সড়কপথে দুর্ঘটনার চিত্র দেওয়া হলো। ২০১৫ সালে ঈদের আগে-পরের ১৫ দিন ২১০টি দুর্ঘটনায় ৩১৪ জন প্রাণ হারায় (গড়ে প্রতিদিন ২১ জন) এবং আহত হয় ১০২১ জন। ২০১৫ সালে ঈদের পরে দুই দিনে ৯০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। যেসব যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল এর মধ্যে বাস (৩৫ শতাংশ), মোটরসাইকেল, ট্রাক ও মাইক্রোবাসের সংখ্যা অধিক। দুর্ঘটনার প্রকারের মধ্যে পথচারীকে আঘাত করা (২৭ শতাংশ), পেছন থেকে অন্য গাড়িকে আঘাত করা (২৭ শতাংশ), মুখোমুখি সংঘর্ষ (১৭ শতাংশ) ও গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা (১৩ শতাংশ) উল্লেখযোগ্য। ঈদের ওই সময়ে ঢাকা, বগুড়া, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও মুন্সীগঞ্জ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা বেশি ছিল। ২০১৬ সালে ঈদের আগে-পরের ১১ দিন ৯৭টি দুর্ঘটনায় ২৬২ জন প্রাণ হারায় (গড়ে প্রতিদিন ২৪ জন) এবং আহত হয় ৭৪৬ জন। যেসব যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল এর মধ্যে বাস (৪১ শতাংশ), মোটরসাইকেল, ট্রাক (২৬ শতাংশ) ও মাইক্রোবাসের সংখ্যা অধিক। দুর্ঘটনার প্রকারের মধ্যে পথচারীকে আঘাত (২১ শতাংশ), পেছন থেকে অন্য গাড়িকে আঘাত (১৮ শতাংশ), মুখোমুখি সংঘর্ষ (৩৭ শতাংশ) ও গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা (২১ শতাংশ) উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে ঈদের আগে-পরের ১৫ দিন ২২৫টি দুর্ঘটনায় ২৮৯ জন প্রাণ হারায় (গড়ে প্রতিদিন ১৯ জন) এবং আহত হয় ৮১ জন। ২০১৮ সালে ঈদুল ফিতরের আগে-পরের ১৩ দিনে ২৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন প্রাণ হারায় (গড়ে প্রতিদিন ২৬ জন) এবং আহত হয় ১২৬৫ জন। যেসব যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল এর মধ্যে বাস (৩০ শতাংশ), মোটরসাইকেল, ট্রাক (১৮ শতাংশ) ও মাইক্রোবাসের সংখ্যা অধিক। দুর্ঘটনার প্রকারের মধ্যে পথচারীকে আঘাত (২৫ শতাংশ), পেছন থেকে অন্য গাড়িকে আঘাত (২৭ শতাংশ), মুখোমুখি সংঘর্ষ (২৬ শতাংশ) ও গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা (৬ শতাংশ) উল্লেখযোগ্য। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রতি বছর ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। এবারের ঈদযাত্রায় সড়কপথে দুর্ঘটনার সংখ্যা যেন হ্রাস করা যায় সে পদক্ষেপ এখনই নেওয়া প্রয়োজন।

ঈদের আগে-পরে সড়কপথে দুর্ঘটনার হার বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঈদের সময় মহাসড়কের কোথাও কোথাও যানজটের সৃষ্টি হয় অতিরিক্ত গাড়ির চাহিদার কারণে। আর এই যানজটের জায়গাটুকু পার হয়ে ফাঁকা রাস্তা পেয়ে চালকরা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালায় যানজটে ব্যয় হওয়া সময়টুকু পুষিয়ে নেওয়ার জন্য। চালকরা দ্রুতগতিতে ওভারটেক করতে চায় সামনের গাড়িগুলোকে। এভাবেই ঈদের সময় ফাঁকা রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

আরেকটি বিষয় হলো, ঈদের সময় গাড়িচালক যত বেশি ট্রিপ দিতে পারবে, তত বেশি টাকা আয়ের একটি বিষয় জড়িত। সাধারণভাবে যদি দিনে তারা ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালায়, তো ঈদের সময় ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টাও গাড়ি চালানোর রেকর্ড রয়েছে। সর্বক্ষণ চালকের কাছে থাকা ইঞ্জিনের গরম হাওয়া এবং বাইরের ও আশপাশের শব্দের কারণেও চালকরা ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়ে। আর অতিরিক্ত ট্রিপ দেওয়াতে ক্লান্তিজনিত কারণে তাদের ভুল করার আশঙ্কা বেশি থাকে এবং সেখান থেকেই দুর্ঘটনা ঘটে।

ঈদের সময় সড়ক-মহাসড়কে স্থানীয়ভাবে তৈরি মানহীন কিছু যানবাহন চলাচল করে। এসব যানবাহনের গতি তুলনামূলক কম থাকায় অনেক সময় মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দেখা দেয়। ঈদের সময় পেছন থেকে অন্য গাড়িকে আঘাত করা যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে, তার অধিকাংশই ঘটে ধীরগতির এসব স্থানীয়ভাবে তৈরি মানহীন যানবাহনের কারণে। এ ছাড়াও ঈদের সময় অনেকে নিজে গাড়ি চালায় অথবা গাড়ি ভাড়া করে ভ্রমণ করে। এসব ক্ষেত্রে সড়ক-মহাসড়ক ওই চালকদের কাছে খুব বেশি পরিচিত না হওয়ায় অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ঈদের আগে-পরে অতিরিক্ত যাত্রী-চাহিদার কারণে মালিকরা অধিক মুনাফার লোভে ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়ক-মহাসড়কে নামিয়ে দেয়। ঈদের সময় গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারানো যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে তার অধিকাংশই ঘটে এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে। ঈদের সময় যদিও সড়ক-মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ইত্যাদি ভারী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, কিন্তু বিষয়টি কতখানি মনিটর করা হয়- সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা, ঈদের সময় যেসব যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল এর মধ্যে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। যথাযথ মনিটর করা হলে অনেক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।

ঈদের সময় আরেক বিষয় লক্ষণীয়, যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসের ছাদ, পণ্যবাহী ট্রাকের ওপর বিপজ্জনকভাবে ভ্রমণ করে। এসব ক্ষেত্র ওইসব যানবাহন দুর্ঘটনায় পতিত না হলেও ছাদের যাত্রীরা দ্রুতগতির কারণে সড়কের পাশে অবস্থিত গাছের ডালে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ছাদ থেকে ছিটকে পড়ে মারা যায়। এ ব্যাপারে যাত্রীদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ঈদের আগে-পরে সড়কপথের যাত্রা নিরাপদ করতে পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবার দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। ঈদে ঘরমুখো হওয়া ও কর্মস্থলে ফেরার সময় আমাদের নজরদারি রাখা দরকার। পরিবহন মালিকদের ঈদ মৌসুমে ফিটনেসবিহীন বিপজ্জনক গাড়ি সড়কে নামানো থেকে বিরত থাকতে হবে। চালকদের দুটি ট্রিপের মধ্যে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। চালকদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। মালিকদের চাপে তারা যেন বেশি সময় গাড়ি চালাতে বাধ্য না হয় এ ব্যাপারে প্রশাসনকে কড়া নজরদারি রাখতে হবে। চালকরা যেন অতি দ্রুতগতিতে গাড়ি না চালায়, সড়কের বাঁকে বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক না করে, সে ব্যাপারে তাদের অনুরোধ; প্রয়োজনে সতর্ক করতে হবে। অনেক সময় কোনো কোনো যাত্রী চালককে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাতে প্ররোচিত করে, যা মোটেই কাম্য নয়। যাত্রীদের বিপজ্জনকভাবে বাস-ট্রাকের ছাদে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকা ও নির্দিষ্ট স্থান থেকে বাসে ওঠানামা করা কর্তব্য।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের দায়িত্ব এই সময় অধিক। ফিটনেসবিহীন বিপজ্জনক গাড়ি অথবা বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কেউ যেন সড়ক-মহাসড়কে গাড়ি না চালাতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্দিষ্ট গতিসীমার ওপরে কোনো চালক যেন গাড়ি চালাতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টির ব্যবস্থা রাখতে হবে। হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা ও সড়ক-মহাসড়কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্পিড রাডার বসিয়ে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা যেতে পারে। মনে রাখা দরকার, গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই অনেক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি একজন মানুষের জীবনও সড়ক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করতে পারি, তা হবে পরম পাওয়া। কেননা, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই। সবার ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন, আনন্দদায়ক ও নিরাপদ হোক- এই কামনা করি।

অধ্যাপক ও পরিচালক, দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বুয়েট

Facebook Comments Box

Comments

comments

Posted ৯:৩৮ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮

America News Agency (ANA) |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Dhaka University Centennial & New Beginnings
(13552 বার পঠিত)
স্বামী তুমি কার?
(12861 বার পঠিত)
দল বেঁধে সৈকতে
(1424 বার পঠিত)
[abm_bangladesh_map]
Editor-in-chief :
Sayeed-Ur-Rabb
Corporate Headquarter :

44-70 21st.# 3O1, LIC. New York-11101. USA,

06463215067

americanewsagency@gmail.com

Copyright © 2019-2025Inc. America News Agency (ANA), All rights reserved.ESTD-1997