ড. বদিউজ্জামান | রবিবার, ০১ জুলাই ২০১৮ | প্রিন্ট | 688 বার পঠিত
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী [জন্ম :২৩ জুন, ১৯৩৬]
কথার শুরু জীবনানন্দ দাশের সেই অনির্বচনীয় উপলব্ধি দিয়ে- সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি। জীবনানন্দ দাশ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু তার এ উপলব্ধির মৃত্যু হয়নি; কখনো হয়তো মৃত্যু হবেও না। আমার এ লেখাটির শুরু জীবনানন্দের নিকট থেকে ঋণ নিয়ে- সকলেই নক্ষত্র নয় কেউ কেউ নক্ষত্র; ব্যতিক্রম আরো বিরল; কখনো এক-আধ জনকে মাত্র পাওয়া যায়। অন্য কারো সঙ্গে তুলনা দিয়ে কাউকে ছোট-বড় করা বিব্রতকর। সেভাবে করা ঠিকও হবে না। কেবল এভাবে বললেই বোধ হয় কথাটা সঠিক হবে- অন্যতম নক্ষত্র হলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং তিনি অবশ্যম্ভাবীরূপেই একজন ব্যতিক্রমী নক্ষত্র। তিনি এখনো সক্রিয় সৃষ্টিভুবনের মধ্যে আছেন বলেই তাকে বারবার এরূপ ব্যতিক্রমী নক্ষত্র বলে মনে হয়। তার ব্যতিক্রমী হওয়ার আরো কারণ এখানে যে, আমাদের এ সমকালীন পরিমণ্ডলের মধ্যে তিনি ভৌত অস্তিত্ব নিয়েই আর কারো সঙ্গে তুলনীয় নন; কখনো তুলনীয় ছিলেনও না। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নামে কেবল একজন আছেন, লেখার ভুবনের মধ্যে আর কেউ নেই- এরূপ দৃষ্টান্ত বিরল এবং নিশ্চিতভাবেই তিনি অনতিক্রান্ত।
লেখার জন্য প্রতিশ্রুতি তার নিজস্ব তাগিদ থেকে, তার বিভিন্ন লেখার মধ্যকার সুশৃঙ্খল বক্তব্যগুলো সামনে নিলে প্রতীয়মান হয়, কী গভীর প্রতিশ্রুতি তার এসব লেখার পেছনে পূর্বানুবৃত্তভাবে রয়েছে। তার প্রতিশ্রুতিগুলো নিবিড় আন্তরিক এবং অকৃত্রিম। একত্রে তা অত্যন্ত ঋজুভাবেই আপসহীন। জীবনের কোনো সন্ধিক্ষণেই তিনি যে আপস করেননি; আপস করতে কখনো অভ্যস্ত হননি- এরূপ বিরল। প্রকৃতই আর হয়তো নেই, আমাদের অব্যবহিত সামনে-পেছনে কখনো নেই, কোথাও নেই। আমাদের পরিবর্তনশীল সামাজিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ব্যতিক্রমগুলো কোথায়, কীভাবে তা উপলব্ধি করা অনেকখানি সম্ভব হবে। তার লেখালেখির বিষয়ে কিছু কথা এসেছে তার আত্মজৈবনিক ধরনের রচনায়। এগুলো একত্রে নিলে তার সৃষ্টিভুবনের গঠন পরিস্কার হয়।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই অভিভাবকদের আগ্রহ ছিল, তিনি একজন বড় আমলা হবেন। বিভিন্ন সমস্যার চাপে পিষ্ট অভিভাবকদের অব্যবহিত উজ্জ্বল ভুবনের প্রতি এভাবে আগ্রহ থাকেই। কিন্তু তিনি আমলা হননি। তিনি আমলা হলে হয়তো স্বাভাবিকতার স্রোতেই বিলীন হয়ে একেবারে মিশে যেতে পারতেন। এরূপ ব্যতিক্রমী নক্ষত্র হিসেবে তাকে কখনো পাওয়া যেত না। লেখালেখির আগ্রহ, আত্মপ্রকাশের অভ্যাস তার ছিল শৈশব থেকেই; ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার সূচনাও ছিল সেখানে। সৃষ্টিশীল কিছু আকাঙ্ক্ষা তাকে সাহিত্যের ছাত্ররূপে গঠন করে তোলে। ব্যতিক্রমী হওয়ার শুরু সেখান থেকেই। শুধু সাহিত্যের ভুবনে এলেই ব্যতিক্রম হয় না। প্রকৃত ব্যতিক্রম হয় বিচিত্র দিকে সৃষ্টি হয়ে ওঠা ক্ষমতার ওপর। সে ক্ষমতার উন্মেষ শৈশব থেকেই, চূড়ান্ত বিকাশপ্রাপ্ত হয়ে গেছে কি-না- সে কথা বলা ঠিক হবে না, বরং বিকাশের গতি ক্রমপ্রবহমান; আরো অনেক দূর নিয়ে যাবে তাকে, তাকে যেতেও হবে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার শিক্ষার পশ্চাদভূমি এবং পেশাজীবন একত্রে। তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স, এম.এ. ও পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত, পেশাজীবনের বিকাশও একে কেন্দ্র করে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। স্বাভাবিক অধ্যাপনার জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর এখন এই মুহূর্তে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে বিশেষ সম্মানে ভূষিত হয়ে আছেন। তার সক্রিয় পেশাজীবনের দুটো দিক- এক. অধ্যাপনা, দুই. সৃষ্টিশীল লেখার ভুবনে অব্যাহত ও উত্তরোত্তর আত্মপ্রকাশ। অধ্যাপনার জীবনে তেমন বড় উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হয়তো কিছু নেই, হয়তো আছেও, তবে তাকে গতানুগতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে বন্দি করে তোলা ঠিক হবে না। কথাটি আসে এ কারণে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কিছু অধ্যাপক ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনও, যারা তাদের নিজেদের সময়কে অতিক্রম করে আসতে পেরেছেন, যারা পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের স্মৃতির মধ্যে বেঁচে ছিলেন, বেঁচে আছেন এবং হয়তো বেঁচে থেকেও যাবেন। কারণ অনেক। তথাপি দুটো বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এক. অধ্যাপনার যোগ্যতা, দুই. কোনো অনমনীয় আদর্শিকতা। আসলে দুটো একত্রে মিলেই কারো পরিপূর্ণতা এনে দেয়। এখানেও অধ্যাপনার যোগ্যতার সঙ্গে আদর্শিকতা মিলেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর পরিপূর্ণতা সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ, অধ্যাপকসহ, বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যায়। শুধু কেউ কেউ সে অন্ধকার অতিক্রম করে বেরিয়ে এসে জনগণের ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বেঁচে ওঠেন, বেঁচেও থাকেন। কথাগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, জীবনের বহু বিচিত্র ক্ষেত্রের মতো অধ্যাপকদের মধ্যেও অনেকে, হয়তো অধিকাংশ, রাজনীতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার নিকট বেচাকেনার পণ্য হয়ে ওঠেন। শুধু বিরল কেউ এর বাইরে থাকতে পারেন।
তার লেখালেখির সর্বমোট উপসংহারকে এক কথায় সংক্ষেপিত করা হলে তা স্থিত হয় মাত্র তিনটি পারিভাষিকতার মধ্যে- সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি। তিনটি বিষয়ই মিলিত আকারে এবং সেখানেও তা পূর্বানুবৃত্তে বাঁধা পথ থেকে অনেক দূর অতিক্রম করে এসেছে। কীভাবে তা হয়েছে সে কথাগুলো বলার আগে তার সর্বমোট সৃষ্টিভুবনকে দুটো দিকে বিশেষায়িত করে নেওয়া যায়। এক. বিষয়বস্তু, দুই. রচনারীতি, গদ্যশৈলী, প্রকাশের অপরূপ ক্ষমতা। দুটো ক্ষেত্রেই তার অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যাবে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাহিত্যচর্চার সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সেভাবে কিছু নেই। সমকালের, অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কালের কথা বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে, সেসবের অন্তর্নিহিত সত্য স্বরূপকে আবিস্কার করে নিয়ে এসে সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতির পটভূমিতে স্থাপন করেছেন। ফলে সকল ক্ষেত্রেই তার মতো করে উপসংহার সৃষ্টি হয়ে ওঠে। কেবল সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি বললে সবটুকু বলা হয় না। সবকিছুই একটি বর্ণময় প্রগতিশীল ভুবনে স্থাপিত হয়। সে কারণে কিছু উপসংহারের দিকে তা অগ্রসর হয়ে আসে। কী সে উপসংহার, তা এক কথায় উপস্থাপন করা কঠিন। সংক্ষিপ্ত করলে তা দাঁড়ায়- এক. সেক্যুলারিজম বা ইহজাগতিকতা, দুই. শ্রেণিসংঘাতের পটভূমিতে প্রলেতারীয় মানুষের কথা, সমাজতন্ত্রের মধ্য দিয়ে সেক্যুলার যে ভুবনে মানুষের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, তিন. সেক্যুলার এই পৃথিবীকে সেক্যুলার মানুষের জন্য নবরূপে সৃষ্টি করে তোলা। এখানেই তার সমগ্র সৃষ্টিকর্মে মানুষের কথা আছে, সমাজের কথা আছে; সংস্কৃতির কথা, রাজনীতির কথা আছে। কোনোটি থেকে কোনোটি বিচ্ছিন্ন নয়, তথাপি প্রত্যেকটির পৃথক ভুবন আছে, আবার এগুলো একত্রে মিলিয়ে নিয়েই সম্পূর্ণতা, সমগ্রতা সৃষ্টি হয়ে ওঠে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে মানুষের কথা পূর্বানুবৃত্তভাবে এসেছে। শুধু এসেছে বলা হলে কথার শেষ হয় না। ইহজাগতিক বা সেক্যুলার মানুষই এখানে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ পৃথিবী আসলে এ মানুষের জন্যই। এ মানুষই সকল প্রকার এবং সর্বোচ্চ অধিকারের দাবি নিয়ে সামনে এসেছে। আরো গভীরভাবে লক্ষণীয় হলো, এ মানুষের পেছনে সমাজ বিকাশের সমগ্র ইতিহাস একত্রে দাঁড়ানো, একদা সামন্ত যুগের বন্ধনের নিকট থেকে মুক্তি পাওয়ার আগেই ধনতন্ত্র কিংবা পুঁজিবাদের নিকট তা পড়েছে বন্দিদশায়। অবশ্যম্ভাবীরূপেই এ মানুষের মুক্তির জন্য বিকল্প সৃষ্টি হয়েছে সমাজতন্ত্রের মধ্যে, তবে ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদ এ মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়নি। ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদের বন্ধন ছিঁড়ে, এর দুর্গপ্রাকার ভেঙে দিয়ে যে মানুষ মুক্তির প্রার্থনা করেছে; সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সে মানুষেরই জয়গান করেছেন, তাদের অভিনন্দিত করেছেন; সে মানুষের আন্তরিক ও বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়েছেন। সকল অবস্থা কিংবা পরিস্থিতিতে তিনি এ মানুষের সাফল্যকে অনুসরণ করেছেন, প্রতিবন্ধকতা কিংবা প্রতিরোধগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। এ মানুষ কখনো সাফল্যের দিকে এগিয়ে এলে তাদের আন্তরিকভাবেই বিপুল অভিনন্দিত করেছেন। পৃথিবী সৃষ্টির পর এ পৃথিবীতে মানুষের আসা এবং অধিকার পেয়ে যাওয়ার পর সভ্যতার বিভিন্ন অর্জনের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে চিহ্নিত করে তোলাই হলো সে প্রতিবন্ধকতাগুলো ভেঙে ফেলা, সেগুলো অতিক্রম করে আসার প্রাথমিক শর্ত, মানুষের কিছু সফল পূর্বসূরী মাত্র, পূর্বপ্রজন্মের কিছু মানুষ, কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব মাত্র সে কাজে সাফল্য এনেছেন, মানুষকে ইহজাগতিক সাফল্যের মিছিলে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন। মানুষের এই যে এগিয়ে আসা, তা হলো কিছু অগ্রসর মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। এই সম্মিলিত প্রয়াসের মধ্যেই তাদের পৃথক সাফল্যের ক্ষেত্রগুলোকেও একত্রে চিহ্নিত করা যায়। সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে অন্তরঙ্গ অগ্রসর চেতনাভুবন সৃষ্টি এরূপ সম্মিলিত প্রয়াসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসলে সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার সকল দিকই অশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেউ একটি ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন আবার অন্য কেউ সফল হয়ে থাকতে পারেন অন্য কোনো ক্ষেত্রে। এগুলোকে একত্রে নিয়েই মানুষের অগ্রযাত্রার ইতিহাস সৃষ্টি হয়। কোনো কিছুই ছোট বা গুরুত্বহীন নয়। কিছু করতে পারাটাই বড় কথা। সকলেই পারে না, কেউ কেউ পারে এবং সফল হয়।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যের ছাত্র, কিন্তু সরাসরি সাহিত্য বিষয়ে তার রচনার সংখ্যা বেশি নেই। এমনকি সাহিত্য বিষয়ে তার রচনাও গতানুগতিক সমালোচনা সাহিত্যের প্রথা অতিক্রম করে গদ্যসাহিত্য বা প্রবন্ধ সাহিত্যে রূপ নিয়েছে। কবিতার তুলনায় গদ্য রচনার ভুবন অপেক্ষাকৃত বিশাল ও দিগন্তবিস্তারী। ফলে গদ্য রচনার অর্থই যেমন সাহিত্য নয়, তেমনি সকল গদ্য রচনাই সাহিত্যপদবাচ্য নয়- সে বিষয় নিশ্চিত। কবিতা রচনা সাহিত্য সৃষ্টির অন্তর্গত, তবে মান সম্পর্কে ব্যতিক্রম অনেক, কিন্তু গদ্য রচনা এর তুলনায় আমূল পৃথক। কোনো কোনো গদ্য রচনা সাহিত্য কিন্তু সকল গদ্য রচনা সাহিত্য নয়। যে সকল গদ্য রচনা সাহিত্য, সেখানেও কবিতার অনুরূপ মান এর ব্যতিক্রম অনেক। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্য রচনার ক্ষেত্রে এটা অনেক বেশি উল্লেখযোগ্য এ কারণে যে, তার অধিকাংশ লেখা সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি সম্পর্কযুক্ত। এখানে তার হাতে যা উচ্চমানের সাহিত্য হয়েছে; অপর কোনো দুর্বল, ক্ষমতাহীন লেখকের হাতে তা কখনো সাংবাদিকতা, পাঠ্যপুস্তক, গতানুগতিক সমালোচনা গ্রন্থ, বিষয়ভিত্তিক নোট বই হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃতপক্ষে হয়েছেও সেভাবে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ব্যতিক্রম এখানেও এবং এ জন্য যে, তার বক্তব্যগুলো মৌলিক, সৃষ্টিশীল, প্রকাশশৈলী উচ্চমানের শৈল্পিকতামণ্ডিত, অবশ্যম্ভাবী নিজস্বরূপে। এরূপ দ্বিতীয় আর কোনো দৃষ্টান্ত এখানে নেই, এখনো নেই। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্রাটের মতো তার নিজস্ব ভুবনে। তার এ অবস্থান এবং অর্জন এখনো বিকল্পহীন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনায় নিবিড়ভাবে আসে রাজনীতির কথা। একমাত্র তার লেখাতেই রাজনীতির তাত্ত্বিকতা সমগ্রতা নিয়ে এভাবে এসেছে। সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে এরূপ মিলিত দৃষ্টান্ত আর নেই। তার মতো করে আর যে নেই- তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তার রচনায় রাজনীতির একটি বিশেষায়িত দিক আছে, যা অন্য কারো সঙ্গে মেলে না, প্রকৃতই মেলে না। সাধারণভাবে রাজনীতির ভুবনটি বেশ বড়; সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতির সকল ভুবনই অত্যন্ত বড়। তবে রাজনীতির কথাগুলো হয়তো আরেকটু বড় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নিজের মতো করে নিয়ে। এক হিসাবে রাজনীতি হলো অনেকটা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবনকেন্দ্রিক, তাদের নিবিড় উপলব্ধিকেন্দ্রিক। সেখান থেকে প্রসারিত হয়ে সমাজ ও জীবনের বিভিন্ন প্রান্তিকে পৌঁছে যায়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখায় রাজনীতিকতা হলো তার উপলব্ধিকৃত সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে। এর ফলে তার পূর্ণ উপলব্ধি ভুবনের সঙ্গে তা যুক্ত হয়ে তার ঈপ্সিত মানুষের নিকট, আরো বিশেষায়িতরূপে প্রলেতারীয় মানুষের নিকট পৌঁছে যায়। সে অর্থে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সমগ্র সৃষ্টিকর্মে রাজনীতির বাণীরূপ আসলে প্রলেতারীয় মানুষের জন্য এবং মার্কসীয় শ্রেণিসংঘাত বা শ্রেণিদ্বন্দ্বের ওপর ভিত্তি করে মানুষের বিজয়ের কথা সেখানে আছে। এ মানুষ কোথাও কখনো ধর্ম, বর্ণ, ভাষা এবং অন্য কোনো সীমাবদ্ধতার মধ্যে বন্দি হয়ে নেই। মানুষের বিজয়ের কথা, বিজয়ের আশাবাদ সেখানে আছে। এ কারণে তার রচনায় কখনো নৈরাশ্য নেই, ব্যক্তিগত জীবনের চূড়ান্ত দুঃখের দিনের দুঃখের কথার মধ্যেও কখনো তার আশাবাদ নিঃশেষিত হয়ে যায়নি। ট্র্যাডিশনাল রাজনীতিকথা এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিকতার সঙ্গে এগুলো মিলবে না। এ কারণে কখনো কারো কাছে তা হয়তো ইউটোপীয় বলে মনে হয়েও থাকতে পারে। কিন্তু প্রকৃতই তা নির্বস্তুক অসম্ভবতার মধ্যে নিঃশেষিত হয়ে যায় না, কখনো হতাশা একে আচ্ছন্ন করে না কিংবা ঢেকে দেয় না। এগুলো তার গভীরমূল বিশ্বাস এবং উপলব্ধির অন্তর্গত এখানেও যে তিনি সমকালীন কোনো প্রথাবদ্ধ রাজনীতি এবং অন্যান্য মঞ্চে নিজেকে বিলীন করে দেননি; নিজস্ব কিছু অপরূপ বৈশিষ্ট্য কিংবা ব্যতিক্রম সর্বত্রই বিদ্যমান। এ কারণেও রাজনীতির বিভিন্ন টানাপড়েনের মধ্যে, সুযোগ-সুবিধার বিকিকিনির মধ্যে তাকে কোথাও কখনো পাওয়া যায়নি। এরূপ ব্যতিক্রম এখানেও হয়তো বিরল, হয়তো আর নেইও। তিনি তার উপলব্ধির সমগ্রতা থেকে কখনো যে সরে যাননি, এতে তার গভীর আস্থা ও আত্মপ্রত্যয়ের দৃষ্টান্ত মেলে। সুতরাং সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উপলব্ধির ভুবন তার নিজস্ব, শুধু যে সমকালীন মানুষকে তিনি কিছু দিয়ে গেলেন, তাই নয়। এ কথা বিশ্বাস করতে খুবই আগ্রহ জন্মে যে, একদিন এরূপ ভুবনের সমগ্রতার মধ্যেই এ মানুষের আত্মসাক্ষাৎকার ও আত্মজাগরণ ঘটবে। সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির এ মিলিত রূপের মধ্যে আছে এ ভুবনের পূর্ণ উত্তরাধিকার, বাঙালি মানুষের, হয়তো পূর্ব বাংলার, একালের বাংলাদেশের মানুষের বেশি করে, হয়তো সম্পূর্ণরূপেই। সুতরাং এদেশের মাটিতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আছেন এবং থাকবেন। তার মতো এরূপ বিরল দৃষ্টান্তময় উপস্থিতি আর হয়তো নেই। তার সমগ্র লেখার ভুবনকে সামনে নিলে এখানকার কথাগুলো নিয়ে আরও অনেক অনেক অগ্রসর হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। সেখানে থেকে আরো বহুমাত্রিক বর্ণময় ভুবনে উপনীত হবার সুযোগও বিস্তর রয়েছে। কোনো সম্ভাবনাময় গবেষক হয়তো এভাবে কোনো নতুন পৃথিবীর নিকট পৌঁছাতে আগ্রহী হবেন। কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা এখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনারীতি কিংবা প্রকাশশৈলী বিষয়ে কিছু কথা নিয়ে এসে আপাতত শেষ করতে চাই।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রচনারীতি তার সমগ্র বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এবং তার মতো করেই। এরূপ আর নেই। তার রচনারীতির মধ্যে নতুন শব্দ সংযুক্ত হয়েছে অনেক। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, রচনারীতি নিয়ে তার বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্যে কখনো ছন্দপতন হয়নি। তার রচনারীতির দুটো দিক। এক. শব্দের ব্যবহার, দুই. বাক্যের গঠন। দুয়ে মিলে পূর্ণতার দিকে এক অপরূপ ভুবন গড়ে তোলে। তার ব্যবহূত শব্দ ট্র্যাডিশনাল কিন্তু সেসবের ব্যবহার কিংবা প্রায়োগিকতা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভুবন থেকে। এখানেই তার অপরূপ বৈশিষ্ট্য এবং অন্যের সঙ্গে তার মিল নেই। এ পর্যন্ত বাংলা ভাষার ব্যবহূত, এবং ব্যবহূত একই শব্দ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর হাতে তার ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এবং তার নিজস্ব ভুবনে এসে কী সমৃদ্ধ হতে পারে, তা এখানে তার প্রায় সকল রচনাতেই পাওয়া যাবে। এখানেই লক্ষ্য করা যাবে, বাংলা ভাষার চিরাচরিত একই শব্দ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর হাতে এসে কীভাবে তার নিজস্ব হয়ে উঠতে পারে; কীভাবে তার ভুবন গড়ে তুলে ব্যক্তিত্বের প্রকাশরূপ সৃষ্টি করেও তুলতে পারে, তা এখানে পাওয়া যাবে। তার ব্যবহূত শব্দ, বাক্যগঠন তার নিজস্ব। দুয়ে মিলে তার এ নিজস্বতা; অন্য কারো নয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পূর্ণ একক তার নিজস্ব ভুবনে, তার কোনো বিকল্প নেই। তিনি অদ্বিতীয় ব্যতিক্রমী নক্ষত্র এখানেও। তার বাক্যগঠন ও বাংলা শব্দের ব্যবহার একত্রে মিলেই। এরূপ সম্ভব হয়েছে তার বক্তব্য ও অনুভূতি প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। এভাবে না হলে তার মধ্যে হয়তো ব্যতিক্রম সৃষ্টি হয়ে উঠত না। এগুলো মিলে তার সৃষ্টিভুবনের পরিপূর্ণতা। এসবের মধ্য দিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আছেন এবং থাকবেন। হয়তো শুভ্র সমুজ্জ্বল হয়ে থেকেও যাবেন।
সকল বড় প্রতিভাই বিকল্পহীন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বিকল্প যে হতে পারেনি, এতেই তার প্রকৃত সৃষ্টির ভুবন সুচিহ্নিত। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার লেখালেখির সঙ্গে একত্রে সৃষ্টি হয়ে আছেন। একটি বর্ণাঢ্য সময় ও ভুবনকেও তিনি সৃষ্টি করে তুলেছেন। আমাদের সৌভাগ্য এখানেও যে আমাদের মধ্যে, আমাদের নিকটে, আমাদের সামনে তাকে আমরা পেয়েছি।
২৩ জুন ছিলো অসামান্য এই মানুষ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৮৩তম জন্মদিন। জীবনের নতুন বছরে প্রতি অফুরন্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করছি।
Posted ৯:৩৯ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০১ জুলাই ২০১৮
America News Agency (ANA) | Payel