| শুক্রবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | প্রিন্ট | 722 বার পঠিত
নতুন উত্থান পর্বে দেশের শেয়ারবাজার। বাড়ছে বিনিয়োগ। বাড়ছে শেয়ারদর ও সূচক। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে চালুর পর বাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রথমবারের মতো ৬০০০ পয়েন্টের মাইলফলক পার করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে সূচকটি থেমেছে ৬০০৬ পয়েন্টে। ঈদুল আজহার আগের শেষ কার্যদিবসে সূচকের এই উত্থানে খুশি শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা। অনেকেই এটাকে ‘শেয়ারবাজারের ঈদ উপহার’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
শেয়ারবাজার সূচক হলো তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর হ্রাস-বৃদ্ধির সার্বিক মাপকাঠি। বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি পেলে সাধারণত সূচক বাড়ে, বিপরীতে শেয়ারদর কমলে কমে যায় সূচক। বড় মূলধনি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরের পরিবর্তনই সূচকে বেশি প্রভাব রাখে।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই ও সিএসই) শেয়ারদরের ওঠানামা বোঝাতে আটটি সূচক গণনা করা হয়। এর মধ্যে ডিএসইএক্সই প্রধান। বিদেশিরাও বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে এ সূচকটিকেই মাপকাঠি
হিসেবে গণ্য করেন।
অস্বাভাবিক উত্থানের পর ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর শেয়ারবাজারে বড় ধস নেমেছিল। এরপর টানা প্রায় ছয় বছর নিম্নমুখী ধারায় ছিল শেয়ারবাজার। ওই সময়ের প্রধান সূচক ডিজিইএন সর্বোচ্চ ৮৯১৮ পয়েন্টে উঠেছিল। এরপর ধারাবাহিক দরপতনের ফলে ২০১৩ সালের এপ্রিলে সূচকটি ৩৬০০ পয়েন্টে নেমে যায়। সূচকের নিম্নমুখী ধারা বিনিয়োগকারীদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পরামর্শে ডিএসই ডিজিইএনের পরিবর্তে ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারিতেই ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (ডিএসইএক্স) চালু করে। চালুর দিনে এর অবস্থান ছিল ৪০৫৫ পয়েন্ট। এর পরও দরপতন অব্যাহত থাকায় সূচকটি ওই বছরের ৩০ এপ্রিল সর্বনিম্ন ৩৪৩৮ পয়েন্টে নেমেছিল। ক্রমাগত উত্থান-পতনের পর ২০১৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো সূচক ৫০০০ পয়েন্টের মাইলফলক স্পর্শ করে। গতকাল সূচক ৬০০০ হাজার পয়েন্ট পার করেছে। এই এক হাজার পয়েন্ট বাড়তে সময় লেগেছে প্রায় তিন বছর।
সূচক নতুন মাইলফলকে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে শেয়ারদর অতি মূল্যায়িত হলো কি-না তা নিয়ে কমবেশি মনস্তাত্তি্বক ভীতি রয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। অনেকেই সতর্ক বিনিয়োগ নীতি অনুসরণ করছেন। গত কয়েকদিন ধরে অনেক শেয়ারের দর ওঠানামায় বেশ অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। যে প্রবণতা গতকালও ছিল। এ কারণে সূচক কিছুটা বাড়লেও লেনদেন বেড়েছে সামান্যই। দুই বাজার মিলে গতকাল ৯১৭ কোটি টাকা মূল্যের শেয়ার কেনাবেচা হয়। যা বুধবারের তুলনায় মাত্র পৌনে ৬ কোটি টাকা বেশি।
বাজার সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন, এই মনস্তাত্তি্বক বাধা পার হওয়ায় শেয়ারবাজার আরও উচ্চতায় যাবে। এরই মধ্যে বাজার মূলধন চার লাখ কোটি টাকার পার করেছে। গড়ে দৈনিক কেনাবেচা হচ্ছে হাজার কোটি টাকার শেয়ার। পরবর্তী মাইলফলকে পেঁৗছাতে বেশি সময় লাগবে না বলেও মত দেন অনেকে।
তবে ভিন্নমতও রয়েছে। অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ মনে করেন, সূচক নতুন উচ্চতায় ওঠার ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের শেয়ারের দরবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখেছে। বছরের শুরুতে এ ধারা স্বাভাবিক হলেও এখন ব্যাংকের শেয়ারদর বৃদ্ধি স্বাভাবিক নয়। তিনি বলেন, শেয়ারদর বৃদ্ধির বড় কারণ লভ্যাংশ ঘোষণা। ব্যাংকগুলো অনেক আগেই লভ্যাংশ প্রদান শেষ করেছে। এখন শিল্প খাতের কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা করছে। তবে এগুলোর দর বাড়ছে না। এটাই দুশ্চিন্তার বিষয়।
জানতে চাইলে মার্চেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের এমডি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান সমকালকে বলেন, গত বছরের মে মাস থেকে শেয়ারদর একটু একটু করে বাড়তে শুরু করে। গত নভেম্বর থেকে যা আরও গতি পায়। এক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও কিছুটা বাড়ে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবিরও বড় ভূমিকা ছিল। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংকে আমানতের সুদহার হ্রাস পাওয়ায় শেয়ারবাজারে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
শেয়ারবাজারের এ উত্থান অনেকটা স্বাভাবিক হলেও স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা কিছু আশঙ্কার কথাও বলেছেন। তারা জানান, নতুন এ অগ্রগতির ধারায় সক্রিয় হয়েছে কিছু জুয়াড়ি। বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহীদের কয়েকজন এই জুয়াড়িগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করছেন। এই জুয়াড়িদের ভূমিকা বাড়লে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।
যেমন তালিকাভুক্তির মাত্র তিন সপ্তাহে বিবিএস কেবলস কোম্পানির শেয়ারদর প্রায় ১৬ গুণ অর্থাৎ ১৫৮ টাকায় উঠেছে। মাত্র দুই সপ্তাহে রুগ্ন হয়ে পড়া মুন্নু সিরামিকের শেয়ারদর আড়াই গুণ হয়েছে। কেঅ্যান্ডকিউর মতো বন্ধ কোম্পানির শেয়ারদর এক বছরেরও কম সময়ে সাত গুণ বেড়ে ২৪ টাকা থেকে উঠেছে ১৭০ টাকায়। কারণ ছাড়াই কারসাজিমূলক লেনদেনের মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, ফরচুন সুজ, ইমাম বাটন, লিগ্যাসি ফুটওয়্যারের শেয়ারদর বাড়ছে। বিডি কম্পিউটার্স, ফাইন ফুডস, রহিমা ফুড করপোরেশনস, সালভো কেমিক্যাল, সিনোবাংলার মতো অপেক্ষাকৃত কম মুনাফার কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও কারসাজি হয়েছে বলে জানান বাজার পর্যবেক্ষণকারী কর্মকর্তারা।
এর সঙ্গে গত কয়েক মাসে যুক্ত হয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মালিকানা পরিবর্তনের হিড়িক। স্রেফ মালিকানা পরিবর্তনের খবর, গুঞ্জন বা গুজবে ফ্যামিলিটেক্স, ফু-ওয়াং ফুড, তুংহাই নিটিং, সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস, রহিমা ফুড, মুন্নু সিরামিকসহ ১০-১২টি কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এ ছাড়া কোম্পানির নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণসহ নানা রকমের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আগাম ফাঁস করে শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কিছু জুয়াড়ি ও মালিকপক্ষের একটি অংশ। এমন অভিযোগও রয়েছে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরব ভূমিকা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক রকিবুর রহমান সমকালকে বলেন, বাজার সূচকের নতুন রেকর্ড অবস্থান অবশ্যই আশাবাদী হওয়ার মতো ঘটনা। এর অর্থ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসছে। তবে নতুন উত্থান পর্বের সুবিধা নিতে অনেকেই কারসাজি করতে পারে। এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের সচেতন হতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
রকিবুর রহমান আরও বলেন, বাজার সূচক কতটা বাড়ল, তা নিয়ে পেরেশান হওয়ার কিছু নেই। বিনিয়োগকারীরা যদি সঠিক সময়ে সঠিক শেয়ার সঠিক দামে কেনেন, তবে ক্ষতি হবে না। দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে। শেয়ারবাজারের অগ্রগতি এখনও পর্যন্ত সে হারে বাড়েনি। ফলে অদূর ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারের আরও বড় অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান বলেন, আইন-কানুনসহ কাঠামোগত সংস্কারের কারণেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে। বাজার বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কারসাজি বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিএসইসি সচেতন আছে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
Posted ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৭
America News Agency (ANA) | Payel