বৃহস্পতিবার ১৪ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩১ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

>>

মাতৃভূমির টানে দেশে যাবার অপেক্ষায় লক্ষাধিক প্রবাসী

এনা অনলাইন :   |   শুক্রবার, ২৬ মার্চ ২০২১   |   প্রিন্ট   |   324 বার পঠিত

মাতৃভূমির টানে দেশে যাবার অপেক্ষায় লক্ষাধিক প্রবাসী

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ সালে স্থবির হয়ে পড়েছিল গোটা বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রায় এক কোটি প্রবাসীর বাংলাদেশে যতায়াত এক প্রকার বন্ধ হয়ে পড়েছিল। লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশে যেতে পারেননি। দেখা পাননি স্বজন-প্রিয়জনের। যেতে পারেননি তাদের সান্নিধ্যে। এ বছর করোনার প্রকোপ কমতে শুরু করায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাতৃভূমির টানে বাংলাদেশে যাবার জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছেন লক্ষাধিক প্রবাসী, যা অন্য বছরের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চারগুণ। তবে এই সংখ্যা কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি মালিকানাধীন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো এয়ারলাইন্সের টিকেট বিক্রিতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । প্রবাসীরাও কমদামে অথবা সেলে (বিশেষ ছাড়) টিকেট নিতে খোঁজখবর নিচ্ছেন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে। অন্যদিকে চার বছর বিরতির পর ইতিহাদ এয়ারওয়েজ সম্প্রতি ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে পুনরায় যাত্রীসেবা শুরু করেছে। তারা আকর্ষণীয় দামে টিকেট বিক্রি করছে। এমিরেটস, কাতার, তার্কিশ, সৌদিয়াসহ অন্যান্য এয়ারলাইন্সও অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে টিকেট বিক্রি করছে বলে জানা গেছে। তবে আরো সেলের অপেক্ষায় না থেকে প্রবাসীদের এখনই গ্রীষ্মের টিকেট কেনার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো।

আমেরিকান ট্রাভেল এজেন্সি অ্যাসোসিয়েনের সভাপতি ও রহমানিয়া ট্রাভেলসের কর্ণধার মাওলানা এম কে রহমান মাহমুদ জানিয়েছেন, প্রতিবছর শুধু গ্রীষ্মের ছুটিতেই নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, ফ্লোরিডা, মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া ও মিশিগানসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত রাজ্যগুলো থেকে ৫০-৬০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশে বেড়াতে যান। এছাড়া সারা বছরই বিভিন্ন প্রয়োজনে দেশে যান বহু প্রবাসী। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে গত বছর তারা কেউই দেশে যেতে পারেননি।

তিনি জানান, তার মালিকানাধীন রহমানিয়া ট্রাভেলস করোনা মহামারীর আগে, ২০১৯ সালে, ৩ হাজারেরও বেশি এয়ারলাইন্সের টিকেট বিক্রি করেছিল। নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠিত ১০টি ট্রাভেল এজেন্সি একইভাবে গ্রীষ্মের ছুটিতে গড়ে তিন হাজার করে টিকেট বিক্রি করেছে। কিন্তু ২০২০ সালে এয়ারলাইন্স সেবা বন্ধ থাকায় প্রবাসীরা জরুরি কাজেও দেশে যেতে পারেননি। এ বছর করোনার প্রকোপ কমতে থাকায় প্রবাসীদের ঢল নামতে পারে বাংলাদেশে।

মাওলানা মাহমুদ আরো জানান, করোনাভাইরাসের কারণে এয়ারলাইন্স সেবা বন্ধ থাকায় বাংলাদেশি মালিকানাধীন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো মোটা অংকের অর্থ লোকসান দিয়েছে। অনেক টিকেটের অর্থ ফেরত দিতে হয়েছে।

তিনি জানান, গত বছর তার প্রতিষ্ঠান ৩ লাখ ডলার ফেরত দিয়েছে। পুরো বছরটাই তারা লোকসান টেনেছেন।

বাংলাদেশি মালিকানাধীন সর্ববৃহৎ ও বিশ্বস্ত ট্রাভেল এজেন্সি জ্যাকসন হাইটসের বাংলা ট্রাভেলের (ডিজিটাল ওয়ান) কর্ণধার এবং অ্যাটাবের কার্যকরী সদস্য বেলায়েত হোসেন বেলাল জানান, তার ট্রাভেল এজেন্সিতে প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রবাসীদের ভিড় লেগেই আছে। সবাই এ বছর গ্রীষ্মের ছুটিতে দেশে যেতে যান।

তিনি বলেন, ২০২০ সালে করোনা মহামারীর কারণে যারা দেশে যেতে পারেননি, তারা এ বছর আর অপেক্ষা করতে রাজি নন। এ কারণে দুই বছরের চাপ সামলাতে হচ্ছে।

নিউইয়র্কে ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায় অভিজ্ঞ বেলায়েত হোসেন বেলাল জানান, তার মালিকানাধীন ডিজিটাল ওয়ানই এখন বাংলা ট্রাভেল। বিশ্বস্ততা অর্জন করায় প্রবাসীরা বাংলা ট্রাভেলকেই বেছে নিচ্ছেন।

তিনি জানান, বাংলা ট্রাভেলে এখন রমজান সেল চলছে। মাত্র ৫২৫ ডলারে নিউইয়র্ক-ঢাকা রিটার্ন টিকেট বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সামার টিকেটেও বিশেষ সেল চলছে।

তিনি বলেন, মানুষ এখন আর করোনাকে আগের মতো ভয় পায় না। মাতৃভূমি আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তারা ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন। এ কারণে এ বছর বাংলাদেশে প্রবাসীদের ঢল নামতে পারে।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করোনার প্রকোপ কমতে শুরু করায় এবং টিকা বের হওয়ায় বাংলাদেশে যেতে আর কোনো ঝুঁকি নেই। ধারণা করা হচ্ছে, গ্রীষ্মের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ করোনার টিকা নিয়ে নিতে পারবেন। তাছাড়া এয়ারলাইন্সে চড়তে হলে করোনার নেগেটিভ সনদ বাধ্যতামূলক। এটা এখন খুবই সহজলভ্য। পরীক্ষার ৬-৭ ঘণ্টার মধ্যেই এখন রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। ফলে স্বাচ্ছন্দেই যে কেউ এয়ারলাইন্সের যাত্রী হতে পারছেন। এ বছর গ্রীষ্মে করোনা পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলেও আশা করেন তিনি।

বেলায়েত হোসেন বেলাল প্রবাসীদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, ঢাকা থেকে ফেরার সময়ও প্রবাসীদের করোনা নেগেটিভ সনদ থাকতে হবে। বাংলাদেশেও এখন করোনা পরীক্ষা সহজ হয়ে গেছে। তবে নতুন বিধিমালায় ১২ বছরের উর্ধ্বে যে কারো করোনা নেগেটিভ সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

প্রবাসের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন ট্রাভেল এজেন্সি এস্টোরিয়া ডিজিটাল ট্রাভেলসের কর্ণধার নজরুল ইসলাম প্রবাসীদের সেলের অপেক্ষায় না থেকে এখনই গ্রীষ্মের টিকেট কেনার পরামর্শ দিয়ে বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে কমদামে টিকেট পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এয়ারলাইন্সের চলাচল এখনো সীমিত। যাত্রীর চাপ বাড়লে এয়ারলাইন্সের সংখ্যা বাড়তে পারে। আগে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের প্রতিদিন ফ্লাইট চালু ছিল। করোনার পর এখন সপ্তাহে চারদিন চলাচল করছে।

তিনি বলেন, এখনই ভালো এয়ারলাইন্সে সিট পেতে কষ্ট হচ্ছে। তাই সেলের অপেক্ষায় থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না বলে মত দেন তিনি।
জ্যাকসন হাইটসের ট্রাভেল এজেন্সি স্মৃতি ট্রাভেলস-এর কর্ণধার মাহবুবুর রহমান টুকু বলেন, যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন টিকেট বিক্রি বেশি হচ্ছে। প্রবাসীরা যে কোনোভাবেই হোক এ বছর দেশে যেতে চান।

তিনি জানান, সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত স্মৃতি ট্রাভেলসে কম দামে সব এয়ারলাইন্সের টিকেট বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা চান প্রবাসীরা। ট্রাভেল এজেন্সিতে টিকেট কাটতে আসা প্রবাসীদের দাবি, যুগ যুগ ধরে বিমানবন্দরে প্রবাসীরা হয়রানি হচ্ছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারের কর্তা-ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে এলে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে অসংখ্য অভিযোগ জানানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ হয় না।
গত ২০ মার্চ বাংলা ট্রাভেল-এ টিকেট নিতে আসা উডসাইডের বাসিন্দা প্রকৌশলী আনিসুজ্জামান রোমেল এ প্রতিবেদককে জানান, ২০১৯ সালে তিনি নিউইয়র্কে থেকে ঢাকা অবতরণের পর কাস্টমসের অযথা হয়রানির শিকার হয়েছেন।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ কওে বলেন, ২৮ ঘণ্টা প্লেনে জার্নি শেষে নিজ দেশে নামার পর অকারণে তার ব্যাগ তল্লাশি করা হয়েছে। ল্যাপটপ শুল্কমুক্ত হবার পরও একজন কাস্টমস কর্মকর্তা তার কাছে অনৈতিকভাবে শুল্ক দাবি করেন। পরে কাস্টমসের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোনে অভিযোগ জানিয়ে তিনি সে যাত্রায় রক্ষা পান।

আরেকজন প্রবাসী ব্রুকলিনের বাসিন্দা মোবারক মাতুব্বর অভিযোগ করেন, যতবার তিনি ঢাকায় নামেন, ততবারই বিমানবন্দরে নানাভাবে হয়রানির শিকার হন।

তিনি বলেন, বিমানবন্দরের লাগেজ পেতে চরম হয়রানি হতে হয় যাত্রীদের। বিশেষ করে একসঙ্গে দুটি বেল্টে লাগেজ দেওয়ার কারণে একজন যাত্রীকে তার লাগেজ পেতে দুই বেল্টে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে হয়। অনেকসময় লাগেজ কাটা পাওয়া যায়। জিনিসপত্রও খোয়া যায়। আগে বিমানবন্দরে ম্যাজিস্ট্রেটরা খুবই সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু দুই-তিন বছর ধরে তারা একপ্রকার নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন।

বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, এবার গ্রীষ্মের ছুটিতে সপরিবারে দেশে বেড়াতে যাবেন। তার মত হাজার হাজার মানুষ দেশে যাবেন এ বছর। সরকারের উচিত বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বিমানবন্দরে হয়রানি সম্পর্কে অ্যাটাবের সভাপতি মাওলানা এম কে রহমান মাহমুদ জানান, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেকটাই ভাল। তবে বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ হয়নি। এ সংক্রান্ত প্রবাসীদের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ট্রাভেল এজেন্সিতে টিকেট নিতে এলে অনেকেই তাদের বিমানবন্দরে হয়রানির অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।

তিনি বলেন, হজরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার। অবতরণের পর অনেকেই লাগেজ ট্রলি পান না। অনেক সময় প্রবাসীরা অভিযোগ করে থাকেন, বিমানবন্দরের লাগেজ এরিয়া ও নিরাপত্তা জোনগুলোতে অনাকাক্সিক্ষত লোকজন ঘোরাফেরা করে। এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার। তিনি বিমানবন্দরের সেবা বাড়ানোর জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি প্রসঙ্গে অ্যাটাব সভাপতি বলেন, বাংলাদেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। তবে প্রবাসীদের দেশে গেলে সতর্কভাবে চলাফেরা করা উচিত। যে কোনো সমস্যায় তাদের উচিত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। এ ব্যাপারে দূতাবাসের ওয়েবসাইটে জরুরি ফোন নম্বরও দেওয়া আছে।

প্রবাসীরা যাতে বিমানবন্দরে কোনো প্রকার হয়রানি না হন এবং নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দে দেশে বেড়াতে পারেন, সে ব্যাপারে সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী।

তিনি জানান, প্রবাসীরা রেমিটেন্সযোদ্ধা। প্রায় সময় আমাদের কাছে অভিযোগ আসে যে, প্রবাসীরা বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সোসাইটি প্রবাসীদের অধিকার আদায়ে সবসময় সোচ্চার। এ ব্যাপারে অতীতে অনেকবার সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ উন্নতি হয়নি।

বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ ও সারা দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম. শহীদুল ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রেস উইংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সেলর (রাজনৈতিক) শাহ আলম খোকন জানান, বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রবাসীদের চিন্তিত হবার কোনো কারণ নেই। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। তবে প্রবাসীদের এ বছর বাংলাদেশে যাবার হার বাড়তে পারে। তারা যাতে বিমানবন্দওে অযথা হয়রানি না হন, এজন্য দূতাবাসের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র এবং বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে চিঠি লিখে জানানো হবে।

Facebook Comments Box

Comments

comments

Posted ১২:৪১ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২৬ মার্চ ২০২১

America News Agency (ANA) |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

[abm_bangladesh_map]
Editor-in-chief :
Sayeed-Ur-Rabb
Corporate Headquarter :

44-70 21st.# 3O1, LIC. New York-11101. USA,

06463215067

americanewsagency@gmail.com

Copyright © 2019-2025Inc. America News Agency (ANA), All rights reserved.ESTD-1997