ঢাকা : | মঙ্গলবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ | প্রিন্ট | 841 বার পঠিত
একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
জাতির জীবনে অবিস্মরণীয় এক দিন আজ। সব পথ এসে মিশেছে একই গন্তব্যে। সেই গন্তব্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বাঙালি জাতিসত্তার ঐতিহ্যের মিনার। ভেদাভেদ ভুলে নারী, পুরুষ বসন্তে ফোটা ফুলের স্তবক হাতে নিয়ে ধীরপায়ে যাওয়ার পালা। কণ্ঠে সবার চির অম্লান সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি…’ ভাষা শহীদদের প্রতি অন্তরের অন্তস্তল থেকে নিবেদিত শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে বর্ণিল হয়ে ওঠে শহীদ মিনারের বেদি। আজ অমর একুশে ফেব্রুয়ারি, রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
আজ থেকে ৬৫ বছর আগে বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে ১৯৫২ সালের এ দিনে বুকের রক্তে রঞ্জিত করেছিলেন ঢাকার রাজপথ। পৃথিবীর ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছিল মাতৃভাষার জন্য রফিক, সালাম, বরকত, সফিউর, জব্বারদের আত্মদানের অভূতপূর্ব নজির। তাদের রক্তে শৃংখলমুক্ত হয়েছিল দুঃখিনী বর্ণমালা, মায়ের ভাষা- বাংলা। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে সংগ্রামের সূচনা সেদিন ঘটেছিল, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই বাঙালির কাছে চির প্রেরণার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
মাতৃভাষার জন্য বাঙালির আত্মদানের এ অনন্য ঘটনা স্বীকৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্বে। ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আজ বাঙালির সঙ্গে সারা বিশ্বে দিনটি পালিত হচ্ছে। একুশের প্রথম প্রহর থেকেই জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে ভাষা শহীদদের স্মরণ করছে। বরাবরের মতোই এবারও মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয় সোমবার বিকালেই। রাজধানীর দোয়েল চত্বর, চানখাঁরপুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, পলাশী মোড় থেকে শহীদ মিনারগামী পথগুলোতে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এসব পথে পথে ঐতিহ্যবাহী আলপনা আঁকতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন চারুকলা অনুষদের নবীন শিল্পীরা। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বের সব ভাষাভাষীর প্রেরণার উৎস। পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব ভেদাভেদ ভুলে একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার বাণীতে বলেছেন, ‘আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি এখনও বিজাতীয় আগ্রাসন থেকে মুক্ত হয়নি।’ আজ সরকারি ছুটির দিন। দেশের সর্বত্রই আজ প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে শহীদদের স্মৃতির প্রতি। সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
শ্রদ্ধা নিবেদন : রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পাকিস্তানি শাসকদের গুলিতে প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি প্রথম ফুল দিয়ে দিবসের সূচনা করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক তাদের স্বাগত জানান। শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রপতির পরনে ছিল কালো মুজিব কোট এবং প্রধানমন্ত্রীর পরনে শোভা পাচ্ছিল সাদা-কালো রঙের শাড়ি, তার ওপর কালো রঙের চাদর।
এরপর শহীদ বেদিতে ফুল দেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী। এরপর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিন বাহিনীর প্রধানগণ, পুলিশের মহাপরিদর্শক, অ্যাটর্নি জেনারেল, র্যাবের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারসহ বিদেশী মিশনের কূটনীতিকরা। এরপর শ্রদ্ধা জানান, আওয়ামী লীগ, ১৪ দল, জাতীয় পার্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি, সেক্টরস কমান্ডারস ফোরাম, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষাসৈনিকরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, একে আজাদের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাসদ, বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, সফররত নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোরজ বেন্দে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষরা। পরে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, জাতীয় ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। রাত সাড়ে ১২টার পর শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের জনগণের জন্য শহীদ মিনার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ ধারণ করে, খালি পায়ে আবালবৃদ্ধ সবাই আজ শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। শুধু ঢাকাতেই নয়, সারা দেশের স্কুল-কলেজ, জেলা ও থানা প্রশাসনের উদ্যোগে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় দেশের সর্বস্তরের মানুষ। একুশের চেতনা আমাদের আত্মমর্যাদাশীল করেছে। দুর্জয় সাহস জুগিয়েছে। ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’- চিরকালের এ স্লোগান আজও সমহিমায় ভাস্বর। একুশ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, যাবতীয় গোঁড়ামি আর সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে শুভবোধের অঙ্গীকার।
কর্মসূচি : এ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুরে শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা সভা। আগামীকাল বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা। এদিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে ৫ সেক্টরে ভাগ করে নিরাপত্তা সাজিয়েছে এলিট ফোর্স র্যাব। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃংখলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে র্যাব তিন স্তরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে।
Posted ১১:২৬ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
America News Agency (ANA) | Payel