শিরোনাম

প্রচ্ছদ খোলা কলাম, শিরোনাম

মা, মাতৃত্ব এবং আমাদের সংস্কৃতি

নাসরীন সুলতানা : | বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯ | সর্বাধিক পঠিত

গত ১২ মে পালিত হলো মা দিবস। মা দিবস নিয়ে অনেক বিতর্ক। কেউ কেউ মনে করছেন, এটা পশ্চিমা সংস্কৃতি। অতএব এ দিবস পালন করা অন্যায়। কেউ মনে করছেন, মা দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা মাকে এবং তার ভালোবাসাকে একটা দিবসের ফ্রেমে বেঁধে ফেলছি; অন্যান্য দিনে মাকে ভালোবাসার কথা বলছি না। গত বছর কানাডা থাকাকালীন এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে তর্কের এক মুহূর্তে তিনি বলেছিলেন, মা দিবসের পেছনে অনেক বড় বাণিজ্য লুক্কায়িত। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্য বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে মা দিবস পালনে উৎসাহিত করে ইত্যাদি। খুবই অকাট্য যুক্তি। তা আমার মতো ক্ষুদ্র দর্শনের ছাত্রের পক্ষে খণ্ডানো অসম্ভব। তবুও চেষ্টা করতে দোষ কী?

বিভিন্ন কারণে আমরা দিবস পালন করি। যেমন জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী ইত্যাদি আমরা পালন করি জীবনের একটা বিশেষ উপলক্ষ বা ঘটনাকে মনে রাখার জন্য। কিছু দিবস পালন করি কোনো একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষের আত্মত্যাগকে স্মরণ করতে। যেমন মে দিবস বা ভাষাশহীদ দিবস। অন্যদিকে, কিছু দিবস পালন করি একটা শ্রেণি বা গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য দূর এবং তাদের যথাযোগ্য সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য। যেমন উপজাতি দিবস, নারী দিবস ইত্যাদি। এখনও অনেক দেশে নারীর প্রতি বৈষম্য করা হয়। ঘরে-বাইরে একজন নারীকে পুরুষের তুলনায় বেশি শ্রম দিতে হয়। আর তাই সারাবিশ্বে এত ঘটা করে নারী দিবস পালন করা হয় নারীর অধিকার সমুন্নত রাখতে।

মা দিবস পালন করার মূল উদ্দেশ্য হলো মা ও মাতৃত্বকে সম্মান জানানো এবং সমাজে মায়ের অবদানের স্বীকৃতিদান। আমরা অতিউৎসাহী বাঙালি জেনে বা না জেনে, বুঝে বা না বুঝেই হয়তো একটু বেশি উৎসবমুখর এবং বিশেষ দিবস উদযাপনে ব্যস্ত। আমরা বছরের এই দিন ফেসবুকের ওয়াল মায়ের ছবি এবং মা সম্পর্কিত স্ট্যাটাসে ভরে ফেলি। পরদিনই আবার সব ছুড়ে ফেলে দিই। এটা আমাদের স্বভাবের দোষ। এখন কথা হচ্ছে, আমরা একটা দিবসের তাৎপর্য বুঝতে পারলাম কি পারলাম না, তার ওপরে ওই দিবসের বৈধতা নির্ভর করে কি-না?

কথায় কথায় আমরা যে পশ্চিমা সংস্কৃতির দোষ দিই, সেই সংস্কৃতির মানুষের কি আসলেই মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নেই? কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টাতে যে অধ্যাপকের সঙ্গে আমি কাজ করেছি তার নাম বারনার্ড লিনস্কি। একাধারে তিনি আমার ইন্টেরিম ও থিসিস সুপারভাইজার ছিলেন। তার বাবা লিওনার্ড লিনস্কিও একজন দার্শনিক ছিলেন। আমার সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা হওয়ার আগে আমার ধারণা ছিল, পশ্চিমাদের আবেগ অনেক কম। মা-বাবার প্রতি কোনো শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নেই। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তারা আর সেভাবে তাদের স্মরণ করে না। কিন্তু আমার সুপারভাইজারকে দেখে সে ধারণার পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি বুঝেছি, তারাও মা-বাবাকে ভালোবাসে। আমাদের মতোই ভালোবাসে; শুধু প্রকাশভঙ্গিটা আলাদা।

একদিন আমার সুপারভাইজার তার মেয়েদের কথা বলছিলেন। বললেন, মেয়েদের দেখতে যাবেন। তার তিন মেয়ে। একজন থাকেন নিউইয়র্ক, একজন তাইওয়ান, অপরজন ভ্যাঙ্কুভার। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমাদের কতদিন পরপর দেখা হয়? তোমার প্রতি তাদের কোনো দায়িত্ব নেই?’ শুনে আমার সুপারভাইজার খুব অবাক। খুব সহজ ভঙ্গিতে বললেন, ‘নাহ! আমার প্রতি তাদের কেন দায়িত্ব থাকবে? যখন ইচ্ছা হয় আমরা দেখা করি। তারা কাজের মধ্যে থাকে। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়ে রাখি। তারা সময়মতো রিপ্লাই দেয়। সারাদিন কথা বললে তাদের ডিস্টার্ব হবে। সামনের মে মাসে আমি নানা হতে যাচ্ছি!’ খুশিতে তিনি একেবারে ডগমগ হয়ে গেলেন। কী উচ্ছ্বাস তার! প্রথমবার নানা হচ্ছেন। পরে তিনি আমাকে তার নাতনির ছবি দেখিয়েছিলেন। ছবি দেখানোর সময় আমি তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খেয়াল করছিলাম। তার মুখের হাসি আর আমাদের দেশের নানা-দাদার হাসি আলাদা করা যাবে না। খুশির আসলে কোনো দেশ-জাত-কুল হয় না। মানুষের অনুভূতি একই রকম, শুধু তার প্রকাশভঙ্গি আলাদা। পশ্চিমারা মা দিবস পালন করে বলেই তা খারাপ হয়ে যায় না। তাদের অনেক ভালো দিকও আছে। আমরা ভালোটা গ্রহণ করতে পারছি কি-না, সেটা আমাদের ওপর নির্ভর করছে। আমরা যখন ছেলেমেয়ের জন্মদিন পালন করি, নিজেদের বিবাহবার্ষিকী পালন করি, ভালোবাসা দিবস পালন করি, তার সবই কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে এসেছে। সন্তানের জন্মদিন পালন করা মানে কেবল সন্তানকে একদিনের জন্য ভালোবাসা নয়। নিজেদের বিবাহবার্ষিকী পালন করা মানে কিন্তু বৈবাহিক জীবনের সুখকে একদিনের ফ্রেমে বেঁধে ফেলা নয়। ঠিক একইভাবে মা দিবস পালন করলে মায়ের প্রতি ভালোবাসা কেবল একদিনের জন্য বেঁধে ফেলা হয় না। বরং মা দিবসের তাৎপর্য হচ্ছে সন্তানের জীবনে, সমাজ জীবনে মায়ের অবদানকে স্বীকৃতিদান। যতদিন সমাজে মায়ের অবদান প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, মাকে যথাযোগ্য সম্মান দিতে না পারছি, ততদিন মা দিবস আরও গুরুত্ব সহকারে পালন করা উচিত।

একটা কথা এখানে থেকে যায়, অধ্যাপক লিনস্কির মেয়েদের বাবার প্রতি কোনো দায়িত্ব নেই বলে কি আমাদেরও কি মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব নেই? অধ্যাপক লিনস্কি অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার দায়িত্ব সরকারের। তিনি বৃদ্ধ অবস্থায় বয়স্ক ভাতা পাবেন, যা দিয়ে তিনি খুব ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন। স্বাভাবিকভাবেই তার কথা তার সন্তানদের না ভাবলেও চলবে। আর তাই জীবিকার প্রয়োজনে তার তিন সন্তান তিন দেশে অবস্থান করছে। কিন্তু আমার মা অসুস্থ হলে তার দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে না। তার মৌলিক চাহিদা আমাকেই মেটাতে হবে। কারণ আমাদের মতো গরিব রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও সে পর্যায়ে আসেনি, যে পর্যায়ে এলে রাষ্ট্র ১৬ কোটি মানুষের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে পারবে। স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পিতা-মাতার দায়িত্ব সন্তানকেই নিতে হবে। যেমন করে পিতা-মাতা সন্তানের জন্য কোনো রকম ইনসেন্টিভ পান না, একইভাবে সন্তান পিতা-মাতার জন্য কোনো প্রকার ইনসেন্টিভ পাবেন না। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। আমার দায়িত্বে অবহেলার দায় পশ্চিমারা কেন নেবে?

এবার নিজের কথা বলি। আমি আমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আজ মা দিবস। তুমি জানো, কেন এই দিবস? আমি আমার মাকে গিফট দিলাম, তুমি তো আমাকে কোনো গিফট দিলে না? আজ তো আমার জন্য একটা ছবি আঁকতে পারতে।’ আমার মেয়ের খুব সরল উত্তর, ‘ওহ! আমার এত পড়ার চাপ!’ আমি উত্তর শুনে হাসব, নাকি দুঃখ পাব? দুঃখ পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আমার ছয় বছরের মেয়ে বোঝে, সে তার নিজের পড়াশোনা নিয়ে এত ব্যস্ত যে, আমার জন্য সময় ব্যয় করার তার সময় হয়নি। আমার কাছে মনে হয়েছে, নিনিত যেন আমাদের সমাজের হাজারো সন্তানের প্রতিচ্ছবি। সবাই এখন খুব ব্যস্ত অফিস, কাজ, ব্যক্তিগত জীবন, অনলাইন ইত্যাদি নিয়ে। এত কিছুর ভিড়ে আমরা ভুলেই যাই, আমার আমি হওয়ার পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল। কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে এই পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে। আমার বেড়ে ওঠা, আমার শৈশব, কৈশোর কার আঁচলের ছায়ায় নিরাপদ কেটেছে। সব ভুলে যাই। আমাদের স্মৃতি যে বড্ড ক্ষীণ।

এই কর্মব্যস্ত জীবনে একদিন যদি আমরা আমাদের মায়েদের জন্য রাখি, তাকে একটু সময় দিই, একবার বেশি ভালোবাসি বলি তাতে অন্যায় কিসের? অন্যায় হলো সেখানে, যখন আমরা কেবল ফেসবুকের স্ট্যাটাসের কন্টেন্ট জোগাড় করা কিংবা বাহবা পাওয়ার জন্য মা দিবসকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি; যখন মাকে লক্ষ্য হিসেবে না ভেবে উপায় হিসেবে গণ্য করি।

আমি সব সময় মানি, আমার আজকের আমি হয়ে ওঠা কেবল আমার মায়ের জন্য সম্ভব হয়েছে। তার কাছে আমার যা কিছু ঋণ, তা কয়েক জনমেও শোধ করার নয়। কেউই মায়ের ঋণ শোধ করতে পারে না। মা এই বয়সেও আমাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগার খেয়াল রাখেন। ঘটা করে আমাদের জন্মদিন পালন করেন। বিশেষ উপায়ে চমক দেন। আমরা মায়ের জন্মদিন জানি না বলে তাকে আনন্দ দিতে পারি না। আব্বা নেই বলে তাদের বিবাহবার্ষিকী পালন করতে পারি না। কিন্তু মা দিবস পালন করতে পারি।

আমি জানি, আমার মা প্রতি বছর মা দিবসের উপহারের জন্য অপেক্ষা করেন। যেমন আমার বাচ্চা মেয়ে জন্মদিনের উপহারের জন্য এক বছর অপেক্ষা করে। আমরা জানি, আমার মা আমাদের অনেক ভালোবাসেন। সে ভালোবাসা মা দিবসের সামান্য উপহারে কেনা যায় না। তবুও মাঝেমধ্যে ভালোবাসার স্বীকৃতি দিতে হয়। প্রিয়জনকে ‘ভালোবাসি’- সেই কথাটাও বলতে হয়। ‘ভালোবাসি’ বললে ভালোবাসা দ্বিগুণ হয়ে যায়। ভালোবাসা দ্বিগুণ করতে পারাটাও অনেক আনন্দের। আসুন, আমরা আমাদের মাকে প্রতিদিনই ‘ভালোবাসি’ বলি। আর মা দিবসে একবার বেশি করে বলি- মা ভালোবাসি। মা, তোমায় বেশি বেশি ভালোবাসি।

সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

nsultana00ju@gmail.com

Comments

comments

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১