শিরোনাম

প্রচ্ছদ জাতীয়, শিরোনাম

ঢাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ছাদবাগান

মামুনুর রশীদ মিতুল, ঢাকা : | শুক্রবার, ১০ মে ২০১৯ | সর্বাধিক পঠিত

ঢাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ছাদবাগান

ইট-পাথরের শহর ঢাকা। যান্ত্রিক এই শহরের মানুষের ক্লান্তির নিঃশ্বাস ফেলার জন্য কয়েকটি পার্ক ছাড়া নেই কোনো খোলা জায়গা। মেগা এ সিটির মানুষের বিষমুক্ত শাকসবজি পাওয়া স্বপ্নের ব্যাপার। তৃপ্তির সবজির জন্য তারা বেছে নিয়েছেন বিকল্প পথ। নগরীর বেশির ভাগ ভবনের ছাদ পড়ে আছে ফাঁকা। এ ছাদকেই নিজ হাতে চাষ করে ফরমালিনমুক্ত ফল-ফুল, শাকসবজির জন্য বেছে নিয়েছে রাজধানীবাসী। তাই তারা নিয়মিত ছাদেই চাষ করছেন শাকসবজি, ফলমূল ও ঔষধি গাছ। রাতারাতিই রাজধানীতে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ছাদবাগান। নানান ফসলে সমৃদ্ধ হচ্ছে বেশির ভাগ ভবনের ফাঁকা ছাদ। একেকটি ফাঁকা ছাদ এখন পরিণত হয়েছে সবুজ-শ্যামল মাঠে। দিন দিন শখের এসব বাগানে বাড়ছে নতুন নতুন গাছের সংখ্যাও।
ছাদবাগানের মালিকেরা বলছেন, নিজের উৎপাদিত স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য শরীরের জন্য যেমন নিরাপদ, তেমনি আবাসন স্থানকে দূষণমুক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে এই ছাদবাগানগুলো। ইচ্ছা ও একটু শ্রমেই বাড়ির ছাদ গড়ে উঠছে একখÐ সবুজ আঙিনায়। আর এ বাগানে স্থান পাচ্ছে থানকুনি, তুলসী, তিন রকমের পুদিনা, অ্যালোভেরাসহ অনেক ঔষধি গাছ। ফলের মধ্যে রয়েছে কয়েক প্রজাতির আম, পেয়ারা, মালবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, থাই জামরুল, মালটা, লেবুসহ আরো অনেক ধরনের ফল গাছ। সবজির মধ্যে আছে লাউ, মরিচ, ঢ্যাঁড়স, বারোমাসি টমেটো, বেগুনসহ সিজনাল শাকসবজি।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উদ্ভিদবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহম্মেদ নিজেও তার বাড়ির ছাদে বাগান করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গাছের অভাবে শহর উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহরেই আমরা যদি কোনো উদ্যানে প্রবেশ করি, তাহলে সেখানে এক রকম তাপমাত্রা আর সেখান থেকে বের হলে তাপমাত্রা কমপক্ষে ২ থেকে ৩ ডিগ্রি বেশি। এতেই বোঝা যায়, আমাদের জন্য গাছ কতটা প্রয়োজনীয়। গাছের অভাবে পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের বাড়ির ছাদে গাছ লাগাই, তাহলে খুব সহজেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
রাজধানীর নিকেতনে জামিল ও সুমা দম্পতি নিজ বাসার ছাদকে গড়ে তুলেছেন একখÐ সবুজ মাঠ হিসেবে। তারা জানান, নিজের হাতে চাষ করা সবজির স্বাদই আলাদা। শখের বশে প্রথমে কিছু ফুলের গাছ লাগাই। পরে কিছু ফলের গাছ লাগিয়ে দেখি ভালো ফলন হয়েছে। এর পর থেকেই সিজনাল শাকসবজি ও অন্যান্য ফলমূল লাগাতে শুরু করি। একদিকে যেমন নিরাপদ সবজি পাচ্ছি, অন্যদিকে বাসাও হয়ে উঠেছে দূষণমুক্ত। বিকেলে বাসার ছাদে গেলে গ্রামের প্রকৃতি উপভোগ করতে পারি। তাদের দেখাদেখি আশপাশের বাসাগুলোর মালিকেরাও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন ছাদবাগানের প্রতি।
নগরীর মানুষকে ছাদবাগানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে সিটি করপোরেশনও। ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন ঘোষণা দিয়েছেন, যারা বাড়ির ছাদে বা আঙিনায় বাগান গড়ে তুলবেন, তাদের বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স ১০ শতাংশ মওকুফ করা হবে।
গ্রিন রোডের রুহেল আহমদ বলেন, বাজার থেকে যে সবজি কিনে আনি তা খেয়ে তৃপ্তি মেটে না। তাই বাসার ছাদে চাষ করছি সিজনাল সবজি। এতে চাহিদামতো সবজি খেতে পারছি, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও খরচও কমছে।
তেজগাঁওয়ের মণিপুরিপাড়ার নাসরিন আক্তার বলেন, অবসর সময়ে ছাদে গিয়ে নিজের চাষ করা সবজি দেখাশোনা করি। এতে বিকেলের সময়টা কাটে সবুজের সঙ্গে আর তৃপ্তিসহকারে খেতে পারি সবজিগুলোও।
ছাদবাগান নিয়ে কাজ করা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পরিবেশ সুরক্ষায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরাঞ্চলে বাড়ির ছাদে বাগান করার বিকল্প নেই। পৃথিবীর অনেক দেশে এখন ছাদে বাগান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা মতে, ছাদের বড় অংশ সবুজে ঢাকা থাকলে সেখানে বায়ুর গড় তাপ হবে ৩২ দশমিক ০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে বাগান ছাড়া ছাদের বায়ুর গড় তাপ পৌঁছায় ৩৫ দশমিক ৯৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এছাড়া ছাদবাগানের বাড়িতে আশপাশের পরিবেশের চেয়ে প্রায় ৭০ পিপিএম কার্বন ডাই-অক্সাইড কম থাকে।
এদিকে ছাদবাগানকে জনপ্রিয় করতে কাজ করছে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এমন এক সংগঠন গ্রিন বাংলাদেশের অনলাইনে সদস্য প্রায় ৫০ হাজার। এদিকে চারা বিতরণ ছাড়াও ছাদকৃষি ও গাছের পরিচর্যাবিষয়ক পরামর্শ দিতে নাইনটি মিনিট স্কুল গড়ে তুলেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এএফএম জামাল উদ্দীন।
এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের প্রায় ৬০ শতাংশ জায়গা কংক্রিটের কাঠামো, যা মূলত শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। ঢাকার পরিবেশদূষণ বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেক বেশি। অধিক জনসংখ্যা, অতিরিক্ত নগরায়ণ, যানবাহন, জলাধার ও গাছপালা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের গাছপালার পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যা ধীরে ধীরে কমে ১৯৯৯ ও ২০০৯ সালে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮-২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০০৯ সালে বেড়ে হয়েছে ২৪-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পরিবেশবাদীদের সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সভাপতি আবু নাসের খান জানান, ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ঢাকা শহর ধীরে ধীরে হট চেম্বারে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু একটু উদ্যোগী হলেই আমরা ইটের বস্তি ঢাকাকে বাগানে পরিণত করতে পারি। ক্রমাগত বৃক্ষনিধনের ফলে ঢাকা মহানগরী আশঙ্কাজনক হারে বৃক্ষশূন্য হয়ে আসছে। ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ঢাকার তাপমাত্রা বাড়ছে, জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া ছাদে বাগান থাকলে পরিবারের একটি বিনোদনের জায়গাও গড়ে ওঠে; সবার মধ্যে মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। বাচ্চাদের গাছপালা ও পশুপাখির প্রতিও ভালোবাসা বাড়ে।

Comments

comments

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১